রবিবার ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ২৪ কার্তিক ১৪৩৩
প্রকাশিত: ২০২৬-১১-০৭ ২১:৪১:২০
"গুরু ঘর বানাইলা কি দিয়া
দরজা জানলা কিছু নাই
কেমনে তোমায় দেখতে পাই?"
কী অদ্ভুত আত্মজিজ্ঞাসা! কয়েকটি পঙ্ক্তি যেন মানুষের অন্তরের দরজায় কড়া নাড়ে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি এই কথার গভীরতা উপলব্ধি করি, নাকি সুরের আবেশে কিছুক্ষণের জন্য মুগ্ধ হয়ে ফিরে যাই আগের জীবনে? যে হৃদয়ে আত্মসমালোচনার দরজা বন্ধ, যে বিবেকে সত্য গ্রহণের জানালা নেই, সেখানে জ্ঞান ও আত্মশুদ্ধি প্রবেশ করবে কীভাবে?
বাংলাদেশের মানুষের কাছে লালন শাহের "খাঁচার ভিতর অচিন পাখি", “সময় গেলে সাধন হবে না", "আমি কোথায় পাব তারে, আমার মনের মানুষ যে রে" কিংবা হাসন রাজার “লোকে বলে বলে রে, ঘরবাড়ি ভালো নাই আমার” বহুল পরিচিত মরমি গানের উদাহরণ।
এসব গানে জীবন, মৃত্যু, আত্মপরিচয়, সময়ের মূল্য এবং দুনিয়ার মোহ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠে আসে। কিন্তু এসব গান শুনে আমরা কতটা নিজেদের পরিবর্তন করি?
"সময় গেলে সাধন হবে না" শুনেও যদি সময়ের অপচয় করি, দায়িত্বে অবহেলা করি, মানুষের অধিকার হরণ করি, তাহলে গানের শিক্ষা কোথায়? "খাঁচার ভিতর অচিন পাখি" শুনেও যদি সম্পদ, ক্ষমতা ও সামাজিক মর্যাদার অহংকারে ডুবে থাকি, তাহলে জীবনের অনিত্যতা উপলব্ধি করার দাবি কতটা সত্য?
বাস্তবতা হলো, অনেকেই আধ্যাত্মিক গানকে আত্মশুদ্ধির উপায় না বানিয়ে নিছক বিনোদনের উপকরণ হিসেবে গ্রহণ করেন। কেউ গানের দর্শন নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেন, কেউ অন্যের সামনে নিজেকে জ্ঞানী প্রমাণ করতে চান। অথচ নিজের আচরণে সত্যবাদিতা, বিনয়, ন্যায়বিচার ও মানবিকতার প্রতিফলন ঘটাতে ব্যর্থ হন। গানের বাণী মুখে ধারণ করে কাজে তার বিপরীত আচরণ করা নিজের সঙ্গে অসততা, অন্যের সামনে জ্ঞানের মুখোশ পরে থাকা আত্মপ্রবঞ্চনা।
আরও উদ্বেগের বিষয়, আধ্যাত্মিকতার নামে কিছু পীর, দরবার ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কোথাও কোথাও ধর্মীয় পথনির্দেশের পরিবর্তে ব্যক্তিপূজা, আরামদায়ক জীবনযাপন, হাদিয়া সংগ্রহ এবং নিয়মিত গানের আসর আয়োজনই মুখ্য হয়ে ওঠে। অবশ্য সব পীর বা ধর্মীয় পথপ্রদর্শককে একইভাবে বিচার করা ন্যায়সংগত নয়। আন্তরিকভাবে মানুষকে নৈতিকতা, ইবাদত ও আত্মশুদ্ধির পথে পরিচালিত করেন এমন ব্যক্তিও রয়েছেন। কিন্তু কেউ যদি আধ্যাত্মিকতার আবরণ ব্যবহার করে মানুষের সরল বিশ্বাসকে উপার্জনের মাধ্যম বানান, নিজের স্বার্থকে প্রাধান্য দেন কিংবা মানুষকে নিজের প্রতি অন্ধ আনুগত্যে অভ্যস্ত করেন, তাহলে তা গভীরভাবে পর্যালোচনার দাবি রাখে। হাদিয়া নিজে অন্যায় নয়; কিন্তু প্রতারণা, জবরদস্তি কিংবা ধর্মীয় আবেগের অপব্যবহার করে অর্থ আদায় নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।
ইসলামের দৃষ্টিতে বাদ্যযন্ত্রসহ গানকে হারাম বলা হয়েছে। তাই কোনো গানকে আধ্যাত্মিক আখ্যা দিলেই তা শরিয়তসম্মত হয়ে যায় না। একজন মুসলিমের উচিত কোরআন-সুন্নাহর আলোকে নিজের বিনোদন ও ধর্মীয় চর্চা যাচাই করা। তবে কোনো গানের কথায় সত্য, সময়ের মূল্য কিংবা অহংকার বর্জনের শিক্ষা থাকলে সেই সত্য উপলব্ধি করে ইসলামের নির্দেশনার আলোকে জীবনে প্রয়োগ করা যেতে পারে।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, “তোমরা যা করো না, তা কেন বলো?” (সুরা আস-সাফ, ৬১:২)। এই আয়াত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, কথার সঙ্গে কাজের মিল থাকা জরুরি। আল্লাহর প্রিয় হওয়ার পথ কেবল আবেগ, গান, বিশেষ পোশাক কিংবা কারও অনুসারী হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রয়োজন বিশুদ্ধ ঈমান, তাকওয়া, আন্তরিক ইবাদত, সৎকর্ম, মানুষের অধিকার রক্ষা এবং নিজের ভুল সংশোধন।
ভাবুন, এসব গানের শিক্ষাকে মানুষ যদি সত্যিই হৃদয়ে ধারণ করত, তাহলে মিথ্যা কম বলত, অন্যের সম্পদ ও সম্মানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতো, অহংকার ত্যাগ করত এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াত। আধ্যাত্মিকতার পরিচয় তখন গানের আসরে নয়, প্রকাশ পেত পরিবারে, কর্মক্ষেত্রে, সমাজে এবং নির্জনে আল্লাহর সামনে নিজের জবাবদিহির অনুভূতিতে।
পরিশেষে, গানের বাণী মুখস্থ করা আর তার শিক্ষা জীবনে ধারণ করা এক বিষয় নয়। মানুষের সামনে জ্ঞানী হওয়া আর আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়াও এক নয়। আধ্যাত্মিকতার প্রকৃত পরীক্ষা আবেগে নয়, আমলে; কথায় নয়, চরিত্রে; আত্মপ্রচারে নয়, আন্তরিকতায়।
তাই আবারও প্রশ্ন করি, “গুরু ঘর বানাইলা কি দিয়া?” আমাদের অন্তরের ঘর কি সত্য, তাকওয়া ও সৎকর্ম দিয়ে নির্মিত, নাকি অহংকার, স্বার্থপরতা ও প্রবঞ্চনা দিয়ে? গান শুনে মুগ্ধ হওয়ার আগে নিজের বিবেককে প্রশ্ন করি। কারণ, যে উপলব্ধি মানুষকে আল্লাহর আনুগত্য, ন্যায়, সততা ও মানবকল্যাণের পথে এগিয়ে নেয়, সেই উপলব্ধিই জীবনের প্রকৃত সম্পদ।