মঙ্গলবার ২০ অক্টোবর ২০২৬, ৫ কার্তিক ১৪৩৩

Logo
Add Image

আলোচিত খবর

সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: জানেনা না বাংলাদেশ দূতাবাস, জানেনা না পরিবার—রায় ও বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে গভীর ধোঁয়াশা

প্রকাশিত: ২০২৬-১০-২০ ২১:৩৯:২৫

News Image

ছবি: সংগৃহিত

টাঙ্গাইল দর্পণ নিউজ ডেস্ক:
সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশি নজরুল ইসলাম আবদুল বশির ও সুইটি আক্তারের মামলার পূর্ণাঙ্গ তথ্য এখনো জানতে পারেনি বাংলাদেশ। ১৪ অক্টোবর তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর প্রকাশ্যে এলেও, জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেটের কাছে থাকা বন্দিদের তালিকায় তাঁদের মৃত্যুদণ্ডের উল্লেখ ছিল না। সৌদি কর্তৃপক্ষও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশ দূতাবাস বা কনস্যুলেটকে আনুষ্ঠানিক কিংবা অনানুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি বলে কনস্যুলেটের একটি গোপনীয় চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

অন্যদিকে, দুই পরিবারের দাবি, কারাগারে থাকা অবস্থায় তাঁরা নিয়মিত বা মাঝেমধ্যে স্বজনদের সঙ্গে ফোনে কথা বলতেন। কিন্তু মৃত্যুদণ্ডের রায় বা তা কার্যকরের বিষয়ে তাঁদের কিছু জানানো হয়নি। নজরুলের পরিবার সর্বশেষ ১১ অক্টোবর তাঁর সঙ্গে কথা বলেছিল বলে জানিয়েছে। সুইটির পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৩ অক্টোবরও তাঁর সঙ্গে কথা হয়েছিল। এর পরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর ছড়িয়ে পড়লে দুই পরিবার অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগের মধ্যে পড়ে।

 

সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে মামলার রায়ের কপি, অভিযোগের বিস্তারিত এবং বিচারিক নথি চেয়েছে বাংলাদেশ। কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা জানার চেষ্টা চলছে। তবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে দুই বাংলাদেশির পক্ষে আইনজীবী বা দোভাষী ছিলেন কি না, তাঁদের পরিবারকে কেন জানানো হয়নি এবং বাংলাদেশি মিশনকে অবহিত না করার কারণ কী, এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি।

 

বন্দিদের তালিকায় ছিল না মৃত্যুদণ্ডের তথ্য
জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেল থেকে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে পাঠানো ১৮ অক্টোবর তারিখের একটি গোপনীয় চিঠিতে দুই বাংলাদেশির আটক ও কারাবাসের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। চিঠির তথ্য অনুযায়ী, নজরুল ইসলাম আবদুল বশিরকে ২০২৩ সালের ১ আগস্ট সৌদি আরবের সাইবার অপরাধ আইনে আটক করা হয়। পরদিন, ২ আগস্ট, ব্যভিচারের অভিযোগে আটক করা হয় সুইটি আক্তারকে।

 

নজরুল ছিলেন জেদ্দা সংশোধনাগারে, আর সুইটি ছিলেন জেদ্দা মহিলা কারাগারে। দুজনই সৌদি আরবের আল মাজাল কোম্পানিতে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন বলে কনস্যুলেটের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

কনস্যুলেটের কাছে থাকা ৩০ সেপ্টেম্বরের বন্দিদের তালিকায় তাঁদের নাম থাকলেও মৃত্যুদণ্ডের কথা লেখা ছিল না। তালিকার একটি কলামে যেসব বন্দির রায় ঘোষণা করা হয়েছে, তাঁদের সাজার সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়ার নিয়ম থাকলেও এই দুই বাংলাদেশির ক্ষেত্রে তা উল্লেখ করা হয়নি।

 

চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, সৌদি আরবে সাইবার অপরাধ ও ব্যভিচারের অভিযোগে কোনো বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার নজির আগে ছিল না বলে কনস্যুলেট উল্লেখ করেছে। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ দূতাবাস বা কনস্যুলেট জেনারেলকে কিছু জানায়নি বলেও চিঠিতে বলা হয়েছে।

 

পরবর্তী সময়ে জেদ্দা কনস্যুলেট সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মক্কা শাখায় একটি কূটনৈতিক নোট পাঠিয়ে রায়ের কপি ও মামলার বিস্তারিত চেয়েছে। নথি হাতে পাওয়ার পর এ বিষয়ে পরবর্তী প্রতিবেদন পাঠানো হবে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

বিচার চলাকালে আইনি সহায়তা ছিল কি না, অজানা
কনস্যুলেটের চিঠিতে দুই বাংলাদেশির বিচার চলাকালে তাঁদের পক্ষে দোভাষী বা আইনি প্রতিনিধিত্ব ছিল কি না, সে বিষয়ে কোনো তথ্য নেই। তাঁদের পরিবারের পক্ষ থেকেও আইনি সহায়তা চেয়ে কনস্যুলেটে কোনো আবেদন বা যোগাযোগ করা হয়নি বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

চিঠির তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের ক্রিমিনাল কোর্টসহ বিভিন্ন আদালতে শুনানির সময় অনুবাদের জন্য ‘মারকাযুত তারজামাহ আল মুওয়াহহাদ’ প্রতিষ্ঠানের সহায়তা নেওয়া হয়। এ ব্যবস্থায় বাংলাদেশি মিশনের পক্ষ থেকে বিচারিক কার্যক্রমে আসামির পক্ষে অনুবাদক হিসেবে যুক্ত হওয়ার সুযোগ থাকে না বলে জানানো হয়েছে।

 

তবে এই দুই বাংলাদেশির মামলায় আদালত কী কী তথ্য-প্রমাণ বিবেচনা করেছে, তাঁদের পক্ষে আইনজীবী ছিলেন কি না, আপিলের সময় কী যুক্তি দেওয়া হয়েছিল এবং কোন পর্যায়ে মৃত্যুদণ্ডের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসে, তা জানতে রায়ের কপি প্রয়োজন।


একটি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রথমে সৌদি আরবের ক্রিমিনাল কোর্টে তাঁদের প্রত্যেককে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। সেই রায়ে সন্তুষ্ট না হয়ে তাঁরা উচ্চ আদালতে আপিল করেন। পরে উচ্চ আদালত তাঁদের মৃত্যুদণ্ড দেন বলে ওই সূত্রে দাবি করা হয়েছে। তবে এই বিবরণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আদালতের নথি এখনো পাওয়া যায়নি।

 

২০২৩ সালে আটক, পরিবারকে জানানো হয়নি মৃত্যুদণ্ডের খবর
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, দুই বাংলাদেশিকে ২০২৩ সালে আটক করা হয়েছিল। কারাগারে থাকা অবস্থায় তাঁরা পরিবারের সঙ্গে মাসে একবার যোগাযোগের সুযোগ পেতেন বলে জানা গেছে। কিন্তু মৃত্যুদণ্ডের সাজা বা তা কার্যকরের বিষয়ে পরিবারকে আগে জানানো হয়নি বলে স্বজনেরা দাবি করেছেন।

 

নজরুল ইসলামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ছয় লাখ টাকা ঋণ নিয়ে ২০২২ সালের ১০ নভেম্বর তাঁকে সৌদি আরবে পাঠান তাঁর বাবা। তখন নজরুলের বয়স ছিল ২২ বছর। সৌদি আরবে যাওয়ার আট মাসের মাথায় তিনি গ্রেপ্তার হন। ওই সময়ও পরিবারের ঋণের সাড়ে চার লাখ টাকা বাকি ছিল।

 

নজরুলের বাবা-মা কারাগার থেকে ছেলের ফোন পাওয়ার অপেক্ষায় থাকতেন। তাঁদের দাবি, সর্বশেষ ১১ অক্টোবর ছেলের সঙ্গে কথা হয়েছিল। দুই থেকে আড়াই মিনিটের সেই কথোপকথনে মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে কিছু জানানো হয়নি।

 

১৪ অক্টোবর বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে সৌদি আরব থেকে ফোন করে পরিবারকে নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কথা জানানো হয় বলে স্বজনেরা জানিয়েছেন।

 

নজরুলের মা রহিমা বেগম বলেন, তাঁর ছেলে মাসে একবার ফোন করতেন এবং অল্প সময় কথা বলতেন। ছেলের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ মিথ্যা দাবি করে তিনি শেষবারের মতো তাঁর লাশ দেখতে চান।

 

সুইটির পরিবারও জানত না মৃত্যুদণ্ডের কথা
অন্য বাংলাদেশি সুইটি আক্তারের সরকারি নথিতে নাম সুইটি আক্তার হিসেবে উল্লেখ থাকলেও পরিবারের কাছে তিনি সুইটি নামেই পরিচিত। তাঁর বাড়ি টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার মহেড়া ইউনিয়নের নগর ছাওয়ালী চরপাড়া গ্রামে। তিনি দিনমজুর ফজল মিয়ার পাঁচ মেয়ের মধ্যে ছোট।

 

পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পারিবারিকভাবে প্রথম বিয়ের পর বিচ্ছেদ হলে ২০১৮ সালের দিকে সুইটির দ্বিতীয় বিয়ে হয়। সেই সংসারও ছয় মাসের মধ্যে ভেঙে যায়। অভাবের সংসারে পরিবারের পাশে দাঁড়াতে তিনি সৌদি আরবে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

 

স্বজনেরা জানান, স্থানীয় দালালের মাধ্যমে দেড় লাখ টাকা ঋণ করে ২০২৩ সালে তাঁকে সৌদি আরবে পাঠানো হয়। সৌদি আরবের মক্কায় আল মাজাল আল-আরাবি গ্রুপ কোম্পানিতে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেন তিনি। প্রথম কয়েক মাস বাড়িতে টাকা পাঠাতেন। পরিবারের হিসাবে, সব মিলিয়ে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পাঠাতে পেরেছিলেন।

 

পরিবারের বক্তব্য অনুযায়ী, সৌদি আরবে যাওয়ার প্রায় ছয় মাস পর একটি ঘটনায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। সুইটি পরিবারের কাছে সহকর্মীদের সঙ্গে বিরোধের কথা বলেছিলেন বলে স্বজনেরা জানিয়েছেন। তবে কনস্যুলেটের চিঠিতে তাঁর আটকের কারণ হিসেবে ব্যভিচারের অভিযোগ উল্লেখ রয়েছে। অভিযোগের প্রকৃত ঘটনা জানতে মামলার নথি প্রয়োজন।

 

সুইটির বাবা ফজল মিয়া জানান, কারাবন্দি হওয়ার পর মেয়ে মাঝেমধ্যে ফোন করতেন। সর্বশেষ ১৩ অক্টোবর তাঁর সঙ্গে কথা হয়েছিল বলে পরিবারের একাধিক বক্তব্যে উল্লেখ রয়েছে। সে সময় সুইটি দুই মাসের মধ্যে দেশে ফিরতে পারবেন বলে আশা প্রকাশ করেছিলেন বলে স্বজনেরা জানিয়েছেন।

 

ফজল মিয়ার দাবি, তাঁর মেয়ে মসজিদের ভেতরে কোনো অনৈতিক কাজে জড়িত ছিলেন না। তিনি বলেন, মেয়ে কাজের উদ্দেশ্যে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন এবং সেখানে একটি কোম্পানিতে কর্মরত ছিলেন। মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে মেয়ে তাঁকে কিছু জানাননি। মেয়ের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য চেয়ে বাংলাদেশ ও সৌদি সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছেন তিনি।

 

সুইটির মা জহুরা বেগমও মেয়ের বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য চান। তাঁর ভাষ্য, মেয়ের জীবিত থাকা বা মৃত্যুর বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য না পাওয়ায় পরিবার অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। সুইটির চার বছর বয়সী একটি মেয়েও রয়েছে বলে পরিবারের সূত্রে জানা গেছে।

 

ছবি ছড়িয়ে পড়ার পর বাড়ে উদ্বেগ
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর ও ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে সুইটির পরিবার উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। ছড়িয়ে পড়া ছবিতে থাকা নারীকে নিজেদের মেয়ে বলে দাবি করেন স্বজনেরা। তবে ছবির পরিচয় এবং সুইটি ওই ঘটনার শিকার কি না, সে বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসনও তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হতে পারেনি।

 

মির্জাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, সুইটির সঙ্গে ছড়িয়ে পড়া ছবির সম্পর্ক বা মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে তখন পর্যন্ত নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। তাঁর বাড়িতে পুলিশ পাঠিয়ে তথ্য সংগ্রহের কথাও জানান তিনি।

 

মির্জাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জহিরুল আলমও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তথ্য না পাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও সুইটির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাননি বলে জানিয়েছেন।

 

এদিকে সৌদি কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মক্কা অঞ্চলের একটি মসজিদে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। তবে ঘটনাটির বিস্তারিত বিবরণ, মসজিদের পরিচয় এবং গ্রেপ্তারের সময় সম্পর্কে প্রকাশিত তথ্য সীমিত।

 

কূটনৈতিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ওই তরুণ-তরুণীর কথিত কর্মকাণ্ডের ভিডিও অন্য একজন ধারণ করেছিলেন। তাঁর নাগরিকত্ব নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে পাকিস্তানি নাগরিক বলা হলেও অন্য সূত্রে ভারতীয় নাগরিক হওয়ার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। ভিডিও ধারণের ঘটনায় ওই ব্যক্তিকেও সাজা দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

 

এ ছাড়া ভিডিওটি বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগে অন্তত আরও ২০ জনকে আটক করে সাইবার অপরাধের মামলায় সাজা দেওয়া হয়েছে বলে একটি কূটনৈতিক সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব তথ্যের পূর্ণাঙ্গ সত্যতা যাচাইয়ের জন্য সৌদি কর্তৃপক্ষের মামলার নথি প্রয়োজন।

 

পশ্চিমাঞ্চলের কারাগারে ৩০৬ বাংলাদেশি আটক
জেদ্দা কনস্যুলেটের আওতাধীন সৌদি আরবের পশ্চিমাঞ্চলের কারাগারগুলোতে বিভিন্ন ধরনের চারিত্রিক মামলায় ৩০৬ বাংলাদেশি আটক রয়েছেন বলে কনস্যুলেটের চিঠিতে জানানো হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ১৪৭ জনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মেয়াদের সাজা ঘোষণা করা হয়েছে। এসব সাজা এক মাস থেকে সর্বোচ্চ ১৫ বছর পর্যন্ত।

 

চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, সাইবার বা তথ্যপ্রযুক্তি আইনের অপরাধে মক্কায় তিনটি পৃথক মামলায় ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তবে নজরুল ও সুইটির মামলার পূর্ণাঙ্গ নথি না থাকায় তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ, প্রমাণ এবং মৃত্যুদণ্ডের বিচারিক ভিত্তি সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না।

 

সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে বাংলাদেশের প্রশ্ন
দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর তাঁদের মামলার রায় ও বিস্তারিত জানতে সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছে বাংলাদেশ। কূটনৈতিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, মৃত্যুদণ্ডের আগে বাংলাদেশি মিশনকে জানানো হয়েছিল কি না, বিচারিক প্রক্রিয়ায় কী ঘটেছে এবং সংশ্লিষ্ট দুই বাংলাদেশি কী ধরনের আইনি সহায়তা পেয়েছিলেন, এসব বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।

 

এ ঘটনায় প্রবাসী শ্রমিকদের আইনি অধিকার ও কনস্যুলার সহায়তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিদেশে কোনো বাংলাদেশি আটক হলে তাঁর পরিবারকে তথ্য জানানো, প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তার সুযোগ তৈরি এবং মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে খোঁজ রাখার বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

 

সৌদি আরব বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান শ্রমবাজার। দেশটিতে ৩৫ লাখের বেশি বাংলাদেশি কাজ করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতি ও লাখো পরিবারের জীবিকায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশে ১৬৫ কোটি মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা ওই সময়ে দেশের মোট রেমিট্যান্সের ১৯ দশমিক ২ শতাংশ।

 

প্রবাসীদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, এমন সংবেদনশীল ঘটনায় অসম্পূর্ণ বা যাচাইহীন তথ্য ছড়িয়ে পড়লে প্রবাসী শ্রমিক ও তাঁদের পরিবারে আতঙ্ক তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে সৌদি আরবে কর্মরত বাংলাদেশিদের অধিকার, নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে পারে। তাই ঘটনার তথ্য যাচাই, কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং দায়িত্বশীল সংবাদ পরিবেশন জরুরি।

 

তবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো মামলার নথির ওপর নির্ভর করছে। তাঁদের বিরুদ্ধে ঠিক কী অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছিল, আপিলে কী সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়, বিচার চলাকালে আইনি প্রতিনিধিত্ব ছিল কি না এবং বাংলাদেশি মিশনকে কেন আগে জানানো হয়নি, এসব বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক জবাব পাওয়া গেলে পুরো ঘটনা আরও স্পষ্ট হবে।
 

Logo
Logo





Logo

আরো পড়ুন

Logo

সম্পাদক : আবু তাহের

© ২০১৪-২০২৬ টাঙ্গাইল দর্পণ, অনলাইন নিউজ পেপার ২৪/৭