শনিবার ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৮ ভাদ্র ১৪৩৩
প্রকাশিত: ২০২৬-০৯-১২ ১৭:৫৬:৩৩
উবাঈদুল হুসাইন আল্ সামি, যশোর প্রতিনিধি:
যশোর আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে চরম অনিয়ম, দুর্নীতি ও দালাল চক্রের রমরমা বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। সরকারি এই সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে সরাসরি সেবা নিতে গিয়ে পদে পদে হয়রানি ও চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। অন্যদিকে, নির্দিষ্ট অংকের অতিরিক্ত টাকা গুণে দালালের মাধ্যমে আবেদন করলে নিমেষেই মিলে যাচ্ছে কাঙ্ক্ষিত সেবা। অনুসন্ধানে জানা গেছে, অফিসের একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী ও স্থানীয় বহিরাগত দালালদের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে এক শক্তিশালী ও প্রভাবশালী সিন্ডিকেট।
ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কোনো সাধারণ আবেদনকারী নিজে নিজে সঠিকভাবে ফরম পূরণ করে জমা দিতে গেলে নানা অজুহাতে তা ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে বাধ্য হয়ে দালালদের শরণাপন্ন হলে সেই একই ফাইল অনায়াসে গৃহীত হয়।
পাসপোর্ট অফিসের নিচতলায় আবেদনের ফাইল জমা নেওয়ার জন্য দুটি মূল কাউন্টার— ৫ ও ৬ নম্বর কাউন্টার বেশি ব্যবহার করা হয়। ৫ নম্বর কাউন্টারে মহিলা, বয়োবৃদ্ধ, অসুস্থ ব্যক্তি ও বীর মুক্তিযোদ্ধারা ফাইল জমা দেন, যেখানে ভিড় তুলনামূলক কম। অন্যদিকে, ৬ নম্বর কাউন্টারটি মূলত দালাল চক্রের মাধ্যমে আসা ফাইল গ্রহণের কাজে ব্যবহৃত হয়। দালালের মাধ্যমে চুক্তিবদ্ধ আবেদনকারীদের আগেই আশ্বস্ত করা হয়, "চিন্তার কিছু নেই, ৬ নম্বর কাউন্টারে ফাইল দেবেন। স্যার আবেদন দেখলেই বুঝে যাবেন।" কারণ দালালের হাত ঘুরে আসা ফাইলগুলোতে থাকে বিশেষ সাংকেতিক চিহ্ন, বিশেষ সিল ও গোপন স্বাক্ষর।
সরকার নির্ধারিত ফি-র বাইরেও ফাইল প্রতি অতিরিক্ত ১ হাজার ১০০ টাকা 'অফিস খরচ' হিসেবে আদায় করছে এই সিন্ডিকেট। দাবিকৃত টাকা না দিলে আবেদনপত্রে বানোয়াট ও কাল্পনিক ত্রুটি দেখিয়ে মাসের পর মাস ঝুলিয়ে রাখা হয়।
চৌগাছা উপজেলার আড়কান্দি গ্রামের যুবক ফারহান আফ্রিদি নিজের তিক্ত অভিজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, "সব কিছু সঠিকভাবে পূরণ করে ১ নম্বর কাউন্টারে জমা দিতে গেলে নাগরিক সনদ নেই বলে আমাকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু বাইরে এসে এক দালালকে ১৫ শত টাকা দেওয়ার পর, সেই একই ফাইল পুনরায় জমা দিলে কোনো প্রশ্ন ছাড়াই গ্রহণ করা হয়।"
একইভাবে শহরের রেল স্টেশন মাদ্রাসা পাড়ার বাসিন্দা হাবিবা খাতুন জানান, তার দুই সন্তানের পাসপোর্ট করতে গিয়ে সরকারি ফি-র চেয়ে অতিরিক্ত তিন হাজার টাকা গুনতে হয়েছে। বাইরের কম্পিউটারের দোকানগুলোর সাথে পাসপোর্ট অফিসের কর্মীদের যোগসাজশে এই চক্র পরিচালিত হচ্ছে।
যশোরের আটটি উপজেলার বিভিন্ন কম্পিউটারের দোকানদার ও দালালদের একটি নির্দিষ্ট কোড বা 'সিম্বল' রয়েছে। ১০ বছর মেয়াদি পাসপোর্টের সরকার নির্ধারিত ফি ৫,৭০০ টাকা হলেও দালালের মাধ্যমে জমা দিলে নেওয়া হয় ৮,০০০ টাকা। অতিরিক্ত টাকা থেকে পাসপোর্ট অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভাগে যায় ১,১০০ টাকা, অনলাইন ফরম পূরণ বাবদ ২০০–৩০০ টাকা এবং বাকি অংশ পায় দালাল।
প্রতিদিন এই অফিসে গড়ে ২০০ থেকে ৩০০টি আবেদন জমা পড়ে, যার প্রায় ৮০ শতাংশই আসে দালালের হাত ধরে। প্রতিদিন গড়ে ১০০টি ফাইল দালালের মাধ্যমে জমা পড়লেও অবৈধ আয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় অন্তত ১ লাখ ১০ টাকা। সে হিসাবে সপ্তাহে ৫ কর্মদিবসে প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকার অবৈধ লেনদেন হচ্ছে। এই ঘুষের টাকা বিশেষ দিনে ভাগাভাগি হয় বলে জানা গেছে।
অফিসে সিসিটিভি ক্যামেরা বসানোর পর কৌশল বদলেছে এই চক্র। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক দালাল জানান, "সিসি ক্যামেরা থাকায় এখন আর ভেতরে যাই না। গেটের বাইরে থেকে চুক্তি করে আবেদনকারীর ফাইলে বিশেষ সংকেত দিয়ে ভেতরে পাঠিয়ে দিই। ভেতরের স্যারেরা সংকেত দেখেই কাজ সম্পন্ন করে দেন।"
অভিযোগের বিষয়ে ১ নম্বর কাউন্টারের এক কর্মকর্তা দাবি করেন, ছোটখাটো ত্রুটি সংশোধন করে জমা নেওয়ায় ভুল বোঝাবুঝি হতে পারে, অনিয়মের সুযোগ নেই।
যশোর আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের উপ-পরিচালক ইসমাইল হোসেন ও উপ সহকারী-পরিচালক মনিরুজ্জামান মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে অফিস সহকারী (কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক) মহিউদ্দিন ফোন ধরে জানান, "স্যার নতুন মানুষ, বিষয়টি তাকে জানানো হয়েছে। আজ ছুটির দিন হওয়ায় তথ্য দিয়ে সহায়তা করা সম্ভব নয়।"
প্রশাসনের কার্যকর নজরদারি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে এই সেবা প্রতিষ্ঠানে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমবে না বলেই মনে করছেন সচেতন মহল।