রবিবার ২৩ আগস্ট ২০২৬, ৮ ভাদ্র ১৪৩৩
প্রকাশিত: ২০২৬-০৮-২৩ ১৮:৫২:০০
উবাঈদুল হুসাইন আল্ সামি, যশোর প্রতিনিধি:
‘গায়ের রেট ৩৯৮ টাকা, কিন্তু দোকানি নিলেন ৪১০ টাকা! কারণ জানতে চাইলে নির্দ্বিধায় বললেন, ভাই, গাড়ি থেকেই কিনতে হইছে ৪০৭ টাকায়, ৩ টাকা লাভে বেচতেছি।’—যশোর শহরের এক খুচরা দোকানে দাঁড়িয়ে এভাবেই নিজের হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করছিলেন মধ্যবিত্ত ক্রেতা জুবায়ের হোসেন। বাজারে তেল কিনতে গিয়ে প্রতিদিন এমন তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। এমআরপি (MRP) বা সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যের সিলটা কি তবে কেবল বোতলের সৌন্দর্য বাড়াতেই ব্যবহার করা হয়, নাকি এটি সাধারণ ক্রেতার সাথে এক ধরনের নিষ্ঠুর উপহাস—এমন প্রশ্ন এখন ঘুরপাক খাচ্ছে প্রতিটি ভুক্তভোগী মানুষের মনে।
বাজারে সরকারি বা কোম্পানির নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে প্রতি লিটার তেলে ৬ থেকে ৮ টাকা বেশি নেওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বর্তমান বাজার ঘুরে এবং ভোক্তাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, রূপচাঁদা, ফ্রেশ, পুষ্টি, নাম্বার ওয়ান, তীর, ফরচুন, বসুন্ধরা, সেনা ও স্টারশিপ ব্র্যান্ডের ১ লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের গায়ের মূল্য ১৯৯ টাকা হলেও বাজারে বিক্রি হচ্ছে ২০৫ টাকায়। একইভাবে দুই লিটার ওজনের বোতলের গায়ে দাম ৩৯৮ টাকা লেখা থাকলেও তা বিক্রি হচ্ছে ৪১০ টাকায়। ৫ লিটারের বোতলজাত সয়াবিনের গায়ে ৯৭৫ টাকা মূল্য মুদ্রিত থাকলেও তা কিনতে হচ্ছে ৯৮০ থেকে ৯৮৫ টাকায়।
বোতলের পাশাপাশি খোলা পণ্যের বাজারেও আগুন। প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ২০৫ টাকায়। খোলা পাম তেল ১৮০ থেকে ১৮৫ টাকা এবং সুপার তেল ১৮৫ থেকে ১৯০ টাকা প্রতি লিটার দরে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া মানভেদে সরিষার তেল ২১০ থেকে ২২০ টাকা ধরে বিক্রি করতে দেখা গেছে। সব মিলিয়ে প্রায় সব ধরনের ভোজ্যতেলের দাম লিটারপ্রতি ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি আদায় করা হচ্ছে।
যশোর বড় বাজারের খুচরা বিক্রেতা লক্ষী ভান্ডার, যশোর ভাণ্ডার, পিয়াসা স্টোর, মা দূর্গা ভাণ্ডার, মেসার্স পদ্মা স্টোর, নিউ রাধা গোবিন্দ স্টোর,পাইকারী বিক্রেতা মেসার্স হাজীয়ালী স্টোর ও বকুলতলার কুণ্ডু ট্রেডার্স ঘুরে একই চিত্র চোখে পড়ে।
দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্প গ্রুপগুলোর কারখানা থেকেই মূলত তেলের এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির সূচনা হয়। মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ‘ফ্রেশ’ সয়াবিন ও পাম তেল, টি কে গ্রুপের ‘পুষ্টি’ ও ‘হিলশা’, সিটি গ্রুপের ‘তীর’, বাংলাদেশ এডিবল অয়েল লিমিটেডের (BEOL) ‘রূপচাঁদা’, ‘ফরচুন’ ও ‘মিজান’, বসুন্ধরা মাল্টি ফুড প্রোডাক্টসের ‘বসুন্ধরা’, এস আলম গ্রুপ ও সেনা কল্যাণ সংস্থার ভোজ্যতেল বাজারে প্রচলিত রয়েছে। এছাড়া প্রাণ এবং এসএ গ্রুপের ‘মুস্কান’ ব্র্যান্ডের তেলও বাজারে পাওয়া যায়।
তবে পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, তাদের এই বাড়তি দামে বিক্রির পেছনে রয়েছে সরবরাহকারী কোম্পানির শক্ত সিন্ডিকেট। চৌগাছা উপজেলার নিমতলা বাজারের সেলিনা সন্স ও আমির ট্রেডার্সের মালিক আমিনুর হোসেন ও আমির হোসেন জানান, ‘ফ্রেশের গাড়ি থেকে আমাদেরই কিনতে হচ্ছে ৪০৭ টাকায় (দুই লিটার)। মাত্র তিন টাকা লাভ রেখে ৪১০ টাকায় বিক্রি করছি। গায়ের দামে তো কিনতেই পারছি না, বিক্রি করব কীভাবে?’
যশোর বড় বাজারের মেসার্স পদ্মা স্টোরের স্বত্বাধিকারী তানভীর ইসলাম সোহান বলেন, ‘বাজারে বোতলজাত তেলের সরবরাহ কম। যদি পাওয়াও যায়, তবে লিটারপ্রতি গায়ের দামের থেকে মাত্র এক-দুই টাকা কম রাখা হয়। দুই লিটার তেলে লাভ হয় মাত্র দুই টাকা। লাভ এত কম হওয়ায় আমি স্টারশিপ ছাড়া অন্য কোনো তেল রাখি না।’
মা দুর্গা ভাণ্ডারের স্বত্বাধিকারী পঙ্কজ মজুমদার জানান, বর্তমান বাজারে ব্যবসা করা অত্যন্ত কঠিন। ক্রেতারা যখন অন্যান্য পণ্য ক্রয় করেন, তখন তেলের সাথে তা সমন্বয় করে পুষিয়ে নিতে হয়। তেলের বাজারে কোম্পানির সিন্ডিকেটের কারণে খুচরা ব্যবসায়ীরাও আজ অসহায়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, প্রতিটি কোম্পানি তেলের সরবরাহের পাশাপাশি তাদের নির্ধারিত ও পছন্দের কিছু বাড়তি পণ্য বা সামগ্রী বাধ্যতামূলকভাবে ক্রয়ের শর্ত জুড়ে দেয়। সেই নির্দিষ্ট পণ্যগুলো না কিনলে তেলের অর্ডার কনফার্ম করা হয় না। বাধ্য হয়ে ব্যবসায়ীদের বাড়তি খরচে সেসব পণ্যও কিনতে হয়, যার পরোক্ষ প্রভাব পড়ে সাধারণ ক্রেতার ওপর।
একজন মধ্যবিত্ত মানুষের দৈনন্দিন জীবন এখন এক চলমান ট্র্যাজেডি। প্রতিদিন বাজারে যাওয়া, পকেটের হিসাব মেলানো আর দিনশেষে হেরে যাওয়াটাই তাদের নিয়মিত রুটিন। যশোর খড়কির বাসিন্দা ডালিয়া সুলতানা আক্ষেপ করে বলেন, ‘দিন দিন সবকিছুর দাম আকাশচুম্বী হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু আমাদের তো বেতন বাড়ছে না। এই পরিস্থিতিতে সংসার চালাতে গিয়ে চরম হিমশিম খাচ্ছি।’
তিনি আরও বলেন, 'এক লিটার বা দুই লিটার সয়াবিন তেলের ওপর বাড়তি ১০-১২ টাকা হয়তো সমাজের বিত্তবানদের কাছে সামান্য ব্যাপার হতে পারে, কিন্তু নির্দিষ্ট আয়ের সীমিত মানুষের কাছে এভাবে প্রতি পদক্ষেপে টাকা খসে পড়া মানে মাসের শেষে শূন্য পকেটে হাত দেওয়া। সবচেয়ে বড় হতাশার বিষয় হলো, প্রতিবাদ করার কোনো উপায় নেই। প্রতিবাদ করতে গেলে অনেক সময় দোকানদার বোতল হাত থেকে কেড়ে নিয়ে বলে দেন, ‘পোষালে নেন, না পোষালে যান।’
বাজারের এই নৈরাজ্য দেখে সাধারণ মানুষের মনে কিছু মৌলিক প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক। বোতলে সরকারের নির্ধারিত বা কোম্পানির প্রিন্ট করা দামের চেয়ে বেশি দামে পণ্য কেন বিক্রি হবে? পাইকারি বাজার বা করপোরেট পর্যায়ে যদি কোনো সিন্ডিকেট থেকে থাকে, তার দায় খুচরা ক্রেতা কেন বহন করবে? জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর (DNCRP) বা প্রশাসনের তদারকি কি তবে শুধু লোক দেখানো অভিযানের দিনগুলোতেই সীমাবদ্ধ থাকবে?
আইনগত সহায়তার পথও সাধারণ মানুষের জন্য দুর্গম। আদালতে যাওয়ার আর্থিক সামর্থ্য মধ্যবিত্তের নেই, আর কর্মব্যস্ত দিনে সরকারি দপ্তরে গিয়ে দীর্ঘ অভিযোগ জানানোর মতো সময় বা সুযোগও দৈনন্দিন বেঁচে থাকার লড়াইয়ে হারিয়ে গেছে। নিরবে সব সহ্য করা ছাড়া যেন আজ তাদের আর কোনো পথ খোলা নেই। পকেটের শেষ সম্বলটুকু দিয়েও যখন নিয়মের কাছে জিম্মি হতে হয়, তখন প্রশ্ন জাগে—বাজার ব্যবস্থা কি সত্যিই সাধারণ মানুষের কল্যাণের জন্য, নাকি কেবল কিছু অসাধু সিন্ডিকেটের পকেট ভারী করার হাতিয়ার?
বাজারের এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি নিয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকেও নিয়মিত তদারকির কথা বলা হচ্ছে। জাতীয় ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তরের যশোর কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক সেলিমুজ্জামান জানান, বাজার নিয়মিত মনিটরিং ও অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। কোথাও কোনো অসংগতি বা অনিয়ম পাওয়া গেলে তা তদারকি করে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
একই সুর যশোর কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের সিনিয়র কর্মকর্তা কিশোর কুমার শাহায়ের গলাতেও। তিনি বলেন, 'সাধারণ মানুষের স্বার্থ রক্ষায় তাঁরা নিয়মিত বাজার তদারকি করে যাচ্ছেন।'
তবে সাধারণ মানুষের দাবি, কেবল লোক দেখানো অভিযান বা নামমাত্র জরিমানা নয়, বরং সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থার মূল উৎস থেকে সিন্ডিকেট ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে হবে। অন্যথায় সাধারণ মানুষের রান্নাঘরের কড়াইতে তেলের ঝাঁঝের সাথে সাথে চোখের জলের ঝাজ আরও বাড়তেই থাকবে।