শনিবার ০৪ জুলাই ২০২৬, ২০ আষাঢ় ১৪৩৩

Logo
Add Image

জেলা খবর

বগুড়ার আদমদীঘিকে অপরাধমুক্ত গড়ার আহ্বান: জুমার নামাজের পর ওসির হৃদয়ছোঁয়া বক্তব্য

প্রকাশিত: ২০২৬-০৭-০৪ ০২:০৭:১৭

News Image

এম আব্দুর রাজ্জাক, বিশেষ প্রতিনিধি: 
বগুড়া জেলার আদমদীঘি থানার কুন্দ গ্রাম ইউনিয়নের, কুন্দগ্রাম বাজার বড় জামে মসজিদ, আদমদীঘি, বগুড়ায় পবিত্র জুমার নামাজ আদায় শেষে উপস্থিত মুসল্লিদের উদ্দেশ্যে সমাজের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা ও করণীয় নিয়ে সচেতনতামূলক বক্তব্য প্রদান করেন আদমদীঘি থানার অফিসার ইনচার্জ মো.কামরুজ্জামান মিয়া।

 

শুক্রবার (৩ জুলাই) কুন্দগ্রাম বড় বাজার জামে মসজিদে বক্তব্যের শুরুতেই তিনি বলেন, একটি নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও মানবিক সমাজ গড়ে তোলা কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একার দায়িত্ব নয়; বরং এটি রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব। সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রত্যেক মানুষকে আইন মেনে চলার পাশাপাশি নিজের বিবেক, নৈতিকতা এবং ধর্মীয় মূল্যবোধকে ধারণ করতে হবে। কারণ মানুষ যখন নিজ থেকেই অন্যায়কে ঘৃণা করতে শেখে এবং ন্যায়কে ধারণ করে, তখন অপরাধ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। তিনি উপস্থিত মুসল্লিদের উদ্দেশ্যে বলেন, পরিবার থেকেই একজন মানুষের চরিত্র গঠনের সূচনা হয়। তাই সন্তানদের সুশিক্ষার পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষা, ধর্মীয় অনুশাসন এবং মানবিক মূল্যবোধে গড়ে তোলার দায়িত্ব প্রতিটি অভিভাবকের।

 

তিনি বিশেষভাবে মাদকের ভয়াবহতা তুলে ধরে বলেন, মাদক একটি নীরব ঘাতক, যা শুধু একজন ব্যক্তির জীবনই নয়, একটি পরিবার, একটি সমাজ এবং একটি জাতির ভবিষ্যৎকে ধ্বংস করে দেয়। একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তি ধীরে ধীরে তার আত্মসম্মান, কর্মক্ষমতা এবং পারিবারিক বন্ধন হারিয়ে ফেলে। অনেক ক্ষেত্রেই মাদকের অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে মানুষ চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, সহিংসতা এমনকি হত্যার মতো জঘন্য অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। তাই তরুণ সমাজকে মাদকের ছোবল থেকে রক্ষা করতে অভিভাবক, শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা এবং সমাজের সচেতন ব্যক্তিদের সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, সন্তানের বন্ধু কারা, কোথায় যাচ্ছে, কী করছে—এসব বিষয়ে অভিভাবকদের নিয়মিত খোঁজ রাখা অত্যন্ত জরুরি।

 

জুয়ার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জুয়া কখনোই ভাগ্য পরিবর্তনের পথ নয়; এটি মানুষের পরিশ্রমের অর্জিত সম্পদ, আত্মসম্মান এবং পারিবারিক সুখ-শান্তিকে ধ্বংস করে দেয়। অনলাইন হোক কিংবা অফলাইন, সব ধরনের জুয়াই মানুষকে অলসতা, লোভ, ঋণগ্রস্ততা এবং অপরাধের দিকে ঠেলে দেয়। সাময়িক লাভের আশায় অনেকেই শেষ পর্যন্ত সর্বস্ব হারিয়ে পরিবারকে চরম সংকটে ফেলে দেন। তাই তিনি সবাইকে এই সামাজিক ব্যাধি থেকে নিজে দূরে থাকার পাশাপাশি অন্যদেরও নিরুৎসাহিত করার আহ্বান জানান।

 

বাল্যবিবাহ সম্পর্কে তিনি বলেন, এটি শুধু আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ নয়, বরং একটি শিশুর স্বপ্ন, শিক্ষা এবং সুন্দর ভবিষ্যৎকে অকালেই থামিয়ে দেওয়ার নাম। অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় বিয়ের ফলে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য ঝুঁকির মুখে পড়ে, শিক্ষাজীবন ব্যাহত হয় এবং সমাজে দারিদ্র্য ও বৈষম্যের চক্র আরও শক্তিশালী হয়। তিনি অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে বলেন, কন্যাসন্তানকে বোঝা নয়, বরং ভবিষ্যতের সম্পদ হিসেবে গড়ে তুলুন। তাকে শিক্ষা, নৈতিকতা এবং আত্মবিশ্বাস দিয়ে এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত করুন, যাতে সে নিজেই সমাজের জন্য অনুকরণীয় হয়ে উঠতে পারে।

 

পারিবারিক দ্বন্দ্ব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অধিকাংশ বিরোধের জন্ম হয় রাগ, অহংকার, ভুল বোঝাবুঝি এবং পারস্পরিক যোগাযোগের অভাব থেকে। সামান্য সমস্যাকে বড় সংঘাতে রূপ না দিয়ে ধৈর্য, সহনশীলতা, ক্ষমাশীলতা এবং আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা উচিত। তিনি বলেন, একটি সুন্দর পরিবারই একটি সুন্দর সমাজের ভিত্তি। পরিবারে শান্তি থাকলে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা সহজ হয়। তাই যে কোনো পারিবারিক সমস্যায় আইন নিজের হাতে তুলে না নিয়ে প্রয়োজনে সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তি, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি কিংবা পুলিশের সহযোগিতা গ্রহণ করা উচিত।

 

জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ নিয়ে তিনি বলেন, আমাদের সমাজে অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘর্ষ, মারামারি এবং প্রাণহানির পেছনে জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ অন্যতম কারণ। কিন্তু সামান্য জমির জন্য একটি প্রাণ হারানো কিংবা দুটি পরিবারের মধ্যে চিরস্থায়ী শত্রুতা সৃষ্টি হওয়া কখনোই কাম্য হতে পারে না। তাই তিনি সবাইকে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে আদালত, প্রশাসন ও পুলিশের সহযোগিতায় শান্তিপূর্ণ এবং আইনসম্মত উপায়ে বিরোধ নিষ্পত্তির আহ্বান জানান।

 

বক্তব্যের শেষাংশে তিনি উপস্থিত মুসল্লিদের উদ্দেশ্যে বলেন, সমাজের যেকোনো অপরাধ, মাদক ব্যবসা, জুয়া, বাল্যবিবাহ, পারিবারিক সহিংসতা কিংবা অন্যায় কার্যক্রম সম্পর্কে জেনেও নীরব থাকা উচিত নয়। একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করা প্রত্যেকের নাগরিক দায়িত্ব। আপনার একটি তথ্য হয়তো একটি পরিবারকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে পারে, একজন তরুণকে মাদকের অন্ধকার পথ থেকে ফিরিয়ে আনতে পারে অথবা একটি নিরপরাধ শিশুকে বাল্যবিবাহের অভিশাপ থেকে মুক্ত করতে পারে।

 

পরিশেষে তিনি উপস্থিত সকলকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে একটি মাদকমুক্ত, অপরাধমুক্ত, শান্তিপূর্ণ ও মানবিক সমাজ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে বলেন, "আইন শুধু অপরাধের বিচার করে, কিন্তু সচেতনতা অপরাধ সৃষ্টি হওয়ার আগেই তা প্রতিরোধ করে। তাই আসুন, আমরা সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে সচেতন হই, পরিবারকে সচেতন করি এবং সমাজকে সুন্দর, নিরাপদ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনের অংশীদার হই। পুলিশ ও জনগণের পারস্পরিক আস্থা, সহযোগিতা এবং অংশগ্রহণই একটি নিরাপদ সমাজ প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি।"

 

এছাড়া তিনি আরো বলেন, আদমদিঘি থানা সব সময় আপনাদের পাশে রয়েছে, আপনাদের বিপদ-আপদে আপনাদের জন্য আদমদিঘী থানা সবসময় খোলা রয়েছে, আপনাদের যে কোন সমস্যায় নিজের কাজের জন্য একা আসবেন, কোন প্রকার দালাল ছাড়ায় থানায় আসবেন।

 

 আমি যত দিন আদমদীঘি থানায় দায়িত্বরত আছি - আপনাদের সেবায় সবসময়ই আছি, ইনশাল্লাহ।

 

এ সময় উপস্থিত ছিলেন, কুন্দগ্রাম বড় বাজার জামে মসজিদের সম্মানিত সভাপতি, সেক্রেটারি, পেশ ইমাম, মুয়াজিম, খাদেম সহ এলাকার সম্মানিত মুসল্লীবৃন্দ।
 

Logo
Logo





Logo

আরো পড়ুন

Logo

সম্পাদক : আবু তাহের

© ২০১৪-২০২৬ টাঙ্গাইল দর্পণ, অনলাইন নিউজ পেপার ২৪/৭