সোমবার ১১ মে ২০২৬, ২৮ বৈশাখ ১৪৩৩
প্রকাশিত: ২০২৬-০৫-১১ ১৫:৪২:১৪
রাজশাহী ব্যুরো:
ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দিন দিন নিচে নেমে যাওয়ায় মরুকরণের পথে বরেন্দ্র অঞ্চল। রাজশাহী, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের অসংখ্য গ্রামে এখন খাওয়ার পানির জন্য হাহাকার। এক সময় যেসব পুকুরের পানি দিয়ে দৈনন্দিন কাজ চলতো, সেগুলো এখন পরিত্যক্ত। বাড়ির উঠানের নলকূপে পানি ওঠে না। যেসব গভীর নলকূপ দিয়ে এক সময় বিঘার পর বিঘা জমিতে সেচ দেওয়া হতো, সেগুলো অচল হয়ে পড়েছে।
বিগত কয়েক দশকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর ও জয়পুরহাটের কিছু এলাকায় পানি সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। গত বছরের ২৪ আগস্ট জাতীয় পানিসম্পদ পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় পাঁচ জেলার ২৫টি উপজেলার ২১৫টি ইউনিয়নের ৪ হাজার ৯১১টি মৌজা ও সাড়ে পাঁচ হাজার গ্রামকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ পানি সংকট এলাকা ঘোষণা করে সরকার। এর মধ্যে ৪৭টি ইউনিয়নের এক হাজার ৫০৩টি মৌজাকে অতি উচ্চ পানি সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
গত বছরের ৬ নভেম্বর এ সংক্রান্ত গেজেট জারি করে সরকার। ২০১৩ সালের পানি আইন অনুযায়ী এই অঞ্চলে খাওয়ার পানি ছাড়া সেচ কিংবা শিল্পকারখানায় আর গভীর নলকূপের পানি ব্যবহার করা যাবে না। প্রজ্ঞাপনে সংকটাপন্ন এলাকায় নতুন করে নলকূপ স্থাপন ও ভূগর্ভস্থ পানি তোলা বন্ধ রাখাসহ ১১টি বিধিনিষেধ দেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে সেই বিধিনিষেধ কেউ মানছে না। ফলে সংকট আরও বাড়ছে।
এসব এলাকায় প্রায় এক কোটি মানুষ সরাসরি পানির সংকটে ভুগছেন। প্রচণ্ড চাপে পড়েছে কৃষি ও ব্যবসা। ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাওয়ায় কৃষি উৎপাদন, পানীয় জলের প্রাপ্যতা ও পরিবেশের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
গবেষকেরা বলছেন, নির্বিচার ভূগর্ভস্থ পানি তোলায় মাটির নিচের পানিধারক স্তর বা ‘অ্যাকুইফার’ মারা যাচ্ছে। পর্যাপ্ত বৃষ্টি হলেও মাটির নিচে পানি জমছে না। সেচব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে, ধান চাষের খরচ বেড়েছে, অনাবাদি হয়ে পড়ছে বিস্তীর্ণ জমি।
ওয়াটার রিসোর্সেস প্ল্যানিং অর্গানাইজেশন (ওয়ারপো) জানিয়েছে, বরেন্দ্রর উঁচু এলাকাগুলোয় পানি সংকট বেশি। দুই দশক আগেও এসব এলাকায় এত সংকট ছিল না। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, ১৯৮৫ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির গড় স্তর ছিল ২৬ থেকে ৩০ ফিট নিচে। ১৯৯৪ সালে তা নেমে আসে ৩৫ ফিটে। ২০০৪ সালে ৫১ ফিট এবং ২০১৩ সালে ৬০ ফিটে নেমে যায়। ২০২১ সালে পানির গড় স্তর দাঁড়ায় ৭০ ফিটের নিচে। ২০২৫ সালে তা ৮০ থেকে ৯০ ফিটে নেমে গেছে। এখন অনেক এলাকায় ১১৩ ফিট খুঁড়েও পানি মিলছে না। কোনো কোনো এলাকায় ২০০ ফিট নিচেও পানির স্তর পাওয়া যাচ্ছে না।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজের (আইবিএস) গবেষণা বলছে, ১৯৮০ সালে পানি ছিল মাত্র ৩৯ ফুট নিচে। ২০১৬ সালে তা নেমে যায় ১১৮ ফুট নিচে। বর্তমানে ১০০ থেকে ১৫০ ফুট নিচে পাতলা একটি পানির স্তর পাওয়া যাচ্ছে। হস্তচালিত বা গভীর নলকূপে সেই পানি উঠছে না।
পরিবেশবাদী সংগঠন ও গবেষকেরা বলছেন, দেশের সবচেয়ে শুষ্ক ও উষ্ণ অঞ্চল বরেন্দ্র। এখানে গ্রীষ্মকালে গড় তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি। তীব্র খরায় তাপমাত্রা ৪০ থেকে ৪৬ ডিগ্রিতে ওঠে। প্রতি বছর গড়ে ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বাড়ছে। গত ৫০ বছরের তথ্য বলছে, ডিসেম্বর-জানুয়ারি ছাড়া বাকি ১১ মাসেই তাপমাত্রা বেড়েছে।
অন্যদিকে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে বরেন্দ্রে ৪০ শতাংশ কম বৃষ্টিপাত হয়। গত এক দশকে বৃষ্টির পরিমাণ একেবারে কমে গেছে। বছরের ৭ থেকে ৯ মাস থাকে বৃষ্টিহীন। ১৯৬৪ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত এই অঞ্চলে বার্ষিক বৃষ্টিপাত কমেছে ৩ দশমিক ৭৪ থেকে ৬ মিলিমিটার হারে। গত দুই দশকে বৃষ্টিপাত সবচেয়ে বেশি কমেছে। ১৯৯৬ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত বছরে গড়ে ১ হাজার ৪৯০ থেকে ১ হাজার ৭৪০ মিলিমিটার বৃষ্টি হতো। ২০০০ সালের পর থেকে তা কমেছে ৩ থেকে ১৬ ভাগ পর্যন্ত। গবেষকেরা বলছেন, ২০৫০ সালের মধ্যে বৃষ্টিপাত সর্বোচ্চ ২৩ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, পল্লী বিদ্যুতের সংযোগ নিয়ে খাওয়ার পানি ছাড়া অন্য কাজ করতে পারেন না গ্রাহকরা। কিন্তু কেউ এই বিধিনিষেধ মানছেন না। আবাসিক সংযোগ নিয়ে অনেকে সাবমারসিবল পাম্প বসিয়ে সেচকাজে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করছেন। পল্লী বিদ্যুৎ শুধু জরিমানা করছে।
রাজশাহীর তানোরের নারায়ণপুর মৌজার উচ্চাডাঙ্গা গ্রামের পানির স্তর সবচেয়ে বেশি নিচে। সেখানে আবাসিক সংযোগ থেকেই ধানের জমিতে সেচ দেওয়া হচ্ছে। এক কৃষক বললেন, ‘জমি পড়ে আছে, খাবেন কী। তাই জীবন বাঁচাতে এ কাজ করছি।’
তানোরের মুণ্ডুমালা পৌর এলাকার আইড়ার মোড়ে একটি ব্যক্তি মালিকানাধীন গভীর নলকূপ থেকে প্রায় ১০০ বিঘা বোরো ধানের জমিতে সেচ দেওয়া হচ্ছে। ব্যবসায়ী জহুরুল ইসলাম জানান, তিন বছর আগে ইউএনও অফিস তাকে নলকূপ বসানোর অনুমতি দিয়েছে।
রাজশাহী, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে ১৯৮৫-৮৬ সালে সেচকাজে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার শুরু করে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)। ১৯৯৩ সাল থেকে এ কাজ করছে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ)। সরকারের নির্দেশনা ছিল তিন জেলার পানিসংকটাপন্ন এলাকায় সেচকাজে সর্বোচ্চ ১১ হাজার ৪০০টি গভীর নলকূপ বসানোর। কিন্তু নির্দেশনা অমান্য করে ৬২ হাজার শ্যালো টিউবওয়েল ও ৪ হাজার গভীর নলকূপ বসানো হয়েছে। এসব নলকূপের সক্ষমতা ২৮ হাজার গভীর নলকূপের সমান।
বিএমডিএ সূত্র জানিয়েছে, নির্বিচার পানি তোলায় কোনো কোনো এলাকায় পানিধারক স্তর মারা গেছে। বালু ধুলায় পরিণত হয়েছে। সেখানে এখন শুধু কাদা। যত বৃষ্টিই হোক, পানি জমছে না।
বিএমডিএর অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আবুল কাশেম বলেন, ‘সরকারের নির্দেশনা ছিল সর্বোচ্চ ১১ হাজার ৪০০ নলকূপ বসানোর। বিএমডিএ পানি তোলে মাত্র ২৭ শতাংশ। বাকি পানি ব্যক্তিমালিকানাধীন পাম্প তুলছে। এগুলো কেউ নিয়ন্ত্রণ করছে না।’
নাচোল উপজেলার বিএমডিএর নলকূপ আছে ৫০২টি। সেখানে ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত পানির স্তর ২৯ দশমিক শূন্য ৯ মিটার থেকে ৩১ দশমিক শূন্য ৪ মিটারে নেমে গেছে। পরে তা আর পুনর্ভরণ হয়নি।
গোদাগাড়ী উপজেলার সুন্দরপুর মৌজায় বিএমডিএর গভীর নলকূপের অপারেটর সাত্তার আলী বললেন, ‘তিন বছর থেকে এই ডিপে পানি উঠছে, আবার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কোন গ্যারান্টি নাই। লিয়ার নিচে নেমে যাচ্ছে দিন দিন। দুই-পাঁচ বছরের মধ্যে যত ডিপ টিউবওয়েল আছে, সব নষ্ট হয়ে যাবে।’ কিষানি সাহানারা বেগম জানান, এক বিঘা বোরো চাষ করতে পানির পেছনে খরচ হচ্ছে ৫ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত।
বিএমডিএর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী নাজিরুল ইসলাম বলেন, ‘সরকারি গেজেটের পর বিএমডিএ কর্মকর্তারাও হতাশ। সেচ কাজে পানি ব্যবহারের বিকল্প ব্যবস্থা না করে কৃষিকাজ বন্ধ করা অসম্ভব।’
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. চৌধুরী সারওয়ার জাহান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘শুধু খাওয়ার পানি তোলার নিয়ম করলে বাড়িতে সাবমারসিবল পাম্প বসিয়ে সেচ দেওয়া হবে। সংকট মোকাবিলায় পদ্মার পানি বরেন্দ্র অঞ্চলে নিতে হবে। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করতে হবে। সরকারি পুকুর, খাল-বিল সেচের জন্য উন্মুক্ত রাখতে হবে এবং কম সেচের ফসলের আবাদ বাড়াতে হবে।’