শুক্রবার ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ৩ বৈশাখ ১৪৩৩
প্রকাশিত: ২০২৫-০৩-০৪ ২১:২৫:৩০
আজ আমি মুক্তি পাবো। দীর্ঘ ৫০৫ দিনের প্রতীক্ষার প্রহর অবশেষে আজ ফুরোতে যাচ্ছে। ঘুম থেকে ওঠে তাই সর্বপ্রথম ইয়াহওয়েহ্-কে ধন্যবাদ জানিয়ে প্রার্থনায় রত হলাম।
দীর্ঘ প্রার্থনা পর্বের সমাপ্তি শেষে ব্যালকনিতে বসে এক কাপ গরম ধোঁয়া ওঠা কফি পান করে স্নানঘরে প্রবেশ করলাম। স্নান শেষে রুমে প্রবেশ করতেই প্রহরী সোহরাব ভাই খাবার দিয়ে গেল। মচমচে কিব্বি ও মাংসের টুকরো মাখানো তাবুন রুটি দিয়ে বিদায় বেলায় ভরপেট আহার সম্পন্ন করে ব্যালকনিতে পায়চারি করতে লাগলাম।
একটু পর,কমান্ডার আব্দুল্লাহ ও সোহরাব ভাই ভেতরে প্রবেশ করলো। আব্দুল্লাহ ভাই আমাকে হাত ধরে বাইরে নিয়ে আসল ও সোহরাব ভাই বাক্স-পেটরা কাঁধে তুলে নিল। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতেই অন্যান্য বন্দিদের দেখতে পেলাম। ওদের সাথে কুশল বিনিময় হলো।
ভবনের সম্মুখে একটি মঞ্চ সাজানো হয়েছে। মাঠ পেরিয়ে প্রধান ফটকের সামনে আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা রেডক্রসের গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে, এতে চড়েই আমরা মাতৃভূমি ইসরায়েলে পরিবারের কাছে ফিরে যাবো।
বেসমেন্টে সবাইকে বসতে দেওয়া হলো। একটুপর হামাসের ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চ কাসেম ব্রিগেডের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত হলে আমাদের মুক্তি প্রদানের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। তাই এই অপেক্ষা। বাকিরা উৎফুল্ল মেজাজে খোশগল্পে রত। কিন্তু,আমার মনসমুদ্রে ভীষণ ঝড় বইছে। অতীতের খেরোখাতায় অংকিত দিনলিপিগুলো মাতাল হাওয়ার ন্যায় অনুভূতির তরীগুলোকে সেই সাগরপাড়ে আছড়ে ফেলছে। মোটকথা,মস্তিষ্কজুড়ে কিসের আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে যেন।
অতীত। যা অনেকটা সময় হৃদয়ের গহীনে লুকায়িত অচেনা ও দুষ্প্রাপ্য অনুভূতিগুলোকে চক্ষুষ্মান করে। আজ আমার ক্ষেত্রে সেটাই হয়েছে। চোখ বন্ধ করে অতীতে হারিয়ে গেলাম।
দিনটি ছিল ২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবর। বান্ধবীকে নিয়ে কিটবুজ সামরিক ঘাটির কাছেই রেইম শহরে সুপারনোভা মিউজিক ফ্যাস্টিভালে যোগ দিয়েছিলাম। যেখানে অশ্লীলতার মাত্রা ও অবাধ যৌনাচার সীমা ছাড়িয়ে যায়। ডিজে গানের তালে তালে নাচছিলো সবাই। আমরা দু'জন তাতে তাল মেলাচ্ছিলাম। ভালোই সময় কাটছিল।
হঠাৎ, আকাশ থেকে ভেসে আসা গুলির শব্দে চমকে উঠি! তাকিয়ে দেখি ঝাঁকে ঝাঁকে মোটর চালিত প্যারাগ্লাইডারে চেপে উদ্যত মারণাস্ত্রে সজ্জিত হয়ে সশস্ত্র বাহিনী উড়ে আসছে। হুড়োহুড়ি করে দিগ্বিদিক ছুটতে থাকি। ওরা মাটিতে অবতরণ করে গুলি ছুড়তে ছুড়তে এগিয়ে আসে। কোন উপায় না পেয়ে মরুভূমির বুকে লাশের স্তূপের মাঝে শুয়ে পড়ি। এভাবে চলে আধাঘন্টা। পরিস্থিতি ওদের অনুকূলে আসলে পুরো এলাকায় পাহারা বসায়। আমার ডান হাতের তালুতে গুলি লেগেছিল। তবুও মাটি কামড়ে শুয়েছিলাম। জীবিতদের ধরে ধরে গাড়িতে তুলছিল। কিয়ৎক্ষণ পর লাশের মাঝে আমাকেও আবিস্কার করল। প্রাথমিক চিকিৎসা নিশ্চিত করে কালো কাঁচের গাড়িতে উঠাল। নিয়ে আসল গাজা উপত্যকার এই নুসাইরাত শরণার্থী শিবিরে।
ভ্রমণের সুবাদে কৈশোরে আমি কয়েকবার এই ক্যাম্পে এসেছি। এটি পৌরসভা শহর দেইর আল বালাহ হতে ৫ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে অবস্থিত। UNRWA-এর প্রচেষ্টায় ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিনি বিতাড়নের পর এই শিবিরটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এই শিবিরের বেশিরভাগ শরণার্থী ফিলিস্তিনের দক্ষিণাঞ্চল বেয়ারশবা এবং উপকূলীয় সমভূমি থেকে আগত।
শুরু হলো আমার বন্দিজীবন। এখানে আসার পরপরই জরুরি বিভাগে আমার ডান হাতের তালুর চিকিৎসা শুরু হলো। এক প্রৌঢ় সামরিক চিকিৎসক বুলেট বের করে হাতে অস্ত্রোপচার করলেন। আমাকে দেখভালের জন্য প্রহরী নিযুক্ত হলো। প্রথম রাতটা হাসপাতালেই কাটালাম। সশস্ত্র প্রহরীদের কমান্ডার গোছের লোকটা রাতে ৪-৫ বার এসে খোঁজ নিয়ে গেল। সকালে ঘুম থেকে ওঠে দেখি প্রাতরাশ হাতে নিয়ে প্রহরীটি দাঁড়িয়ে আছে। খুবই যত্নসহকারে খাবার তুলে খাওয়ালো।
দিনের বেলায় একজন পুরুষ নার্স আমার পাশে নিবিষ্টচিত্তে বসে রইল। এভাবেই কাটল পাঁচদিন। মোটামুটি সুস্থ হওয়ার পর বন্দিশালায় নিয়ে এলো।
প্রথমে ভেবেছিলাম কোন অন্ধ কূপময় বদ্ধ কুঠুরিতে আটকে রাখবে। কিন্তু, বন্দিশালায় আসার পর ভ্রম কেটে গেল। একটা লম্বা হলঘর আমাদের জন্য বরাদ্দ হয়েছে। যেথায় কয়েকজন ইহুদি বন্দি জ্ঞাতি ভাইয়ের আবাস। হলঘরটিতে আড়াআড়িভাবে অনেকগুলো খাটিয়া পেতে রাখা। প্রত্যেক খাটিয়ার সাথে লাগোয়া একটি শেলফ, যা বন্দিদের ব্যক্তিগত ব্যবহারের উপযোগী।
হলঘরের পাশেই বিরাট লাইব্রেরি। তাতে হাজার হাজার বিচিত্র বইয়ের সমাহার। বন্দিরা দিনের বেশিরভাগ সময় এখানেই কাটায়। লাইব্রেরি পেরোলেই খাবার ঘর, যেখানে কয়েকশত বন্দি একসাথে আহার সম্পন্ন করে। তারপর দীর্ঘ এক স্নানঘর। মোটকথা, এ যেন এক মেহমানদারীর সরাইখানা।
ভাবলাম বাসস্থানের উপযুক্ততার পাশাপাশি ওদের ব্যবহারটা উপযুক্ত হলে বাকি দিনগুলো ভালোভাবেই কাটবে। প্রথম কয়েকদিন ওদের কমান্ডার এসে নানাকিছু জিজ্ঞেস করল। তারপর টানা তিনদিন ছোট্ট এক কুঠুরিতে নিয়ে প্রশ্নোত্তর পর্ব চালাল। আমি 'বেসামরিক নাগরিক' জানার পর আমাকে ইস্তফা দিল। দিন কাটতে লাগল বই পড়ে ও ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে। বন্দিশালার প্রহরীরা যথেষ্ট ভালো মানুষ। সকল বন্দিদের সাথে সবসময় ভালো ব্যবহার করে।
আমাদের অভাব ও অভিযোগ খুবই দক্ষতার সাথে মেটাতে চেষ্টা করে। প্রধান প্রহরী আব্দুল্লাহ ভাইয়ের সাথে অল্প দিনেই ভীষণ সখ্যতা গড়ে ওঠেছে। আমার সেবায় নিয়োজিত প্রহরী সোহরাব ভাই চমৎকার মনের অধিকারী। অন্যান্য যুবক প্রহরীদের আমি তুমি ডাকেই সম্বোধন করি। আমাদের মাঝে কোন শ্রেণিবৈষম্য ছিল না। মোটকথা, এই বন্দিশালা একটি পরিবার ও আমরা সকলেই এই পরিবারের সদস্য। এখানে শুধু পুরুষ বন্দিরাই থাকতো। মহিলা বন্দিদের জন্য অন্য কোয়ার্টার বরাদ্দ ছিল।
ওরা আমাদের ধর্মকর্ম পালনে কখনোই বাধা দেয় নি। বরং, লাইব্রেরিতে তালমূতসহ বিভিন্ন ইহুদীবাদী বই রেখেছে। একদিন আমি ওদের ধর্মগ্রন্থ কোরআনের হিব্রু সংস্করণ খুঁজে পাই। সেখানে অনূদিত বিভিন্ন হাদিসের খন্ডও ছিল। মনোযোগ দিয়ে তা পড়তে শুরু করি। হঠাৎ সূরা আল-আনফালে চোখ আটকে যায়। তৎসম্পর্কীয় হাদিস অনুসন্ধানের জন্য মুসলিম শরীফ খুলি। হাদিসে বর্ণিত সুমামা ইবনে উসালের ঘটনা পড়ে বিমোহিত হই। যুদ্ধবন্দিদের প্রতি ওদের সহমর্মিতাপূর্ণ মনোভাব এসব পবিত্র গ্রন্থ হতে উৎসরিত-এটা বুঝতে পারি। মনে মনে ওদের প্রফেট মুহাম্মদ (সা.)-এর ভক্ত বনে যাই। প্রহরীদের প্রতিও আমার ভক্তি শতগুণে বেড়ে যায়।
এতোদিন শুনতাম, ইসলাম একটি সন্ত্রাসবাদী ধর্ম। কিন্তু, কুরআন-হাদীস পাঠে এবং ওদের ব্যবহারে সন্তুষ্ট হয়ে বুঝতে পারলাম যে, ইহুদি প্রশাসন আমাদের অনেক মিথ্যা তথ্য সরবরাহ করে। জিহাদ সম্পর্কে আমার এতোদিনের ধারণা এখানে এসে ভুল বলে প্রমাণিত হলো। কুরআন হতে জিহাদের প্রকৃত স্বরুপ জানতে পারলাম। ওরা আমাদের বিপক্ষে জিহাদে মত্ত, এজন্য আমরাই দায়ী।
১৯১৭ সালে বেলফোর ঘোষণার মাধ্যমে ওদের প্রতি আমাদের অবিচার শুরু হয়। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার পর আমরা শুধু ওদের ভূমি দখল করেই ক্ষান্ত হইনি। ওদের ওপর নির্যাতনের খড়গ চালিয়েছি অনবরত। এখন পর্যন্ত সেটা বিদ্যমান। একটি জাতি আর কতো লাঞ্ছিত হবে? দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে মানুষ প্রতিবাদী হয়। ওরা তাই করছে। ওদের এই নায্য আন্দোলনকে ভেস্তে দিতে আমরা নির্বিচারে গুলি বর্ষণ করছি, মিসাইল মেরে ওদের আবাস গুড়িয়ে দিচ্ছি। আর কতো?
ওদের এই নায্য দাবি অবশ্যই যৌক্তিক। আমরা তো উড়ে এসে জুড়ে বসেছি। সমগ্র ইসরায়েল ভূখণ্ড তো ওদেরই। না, আর ভাবতে পারি না। নিজেকে অনেক অপরাধী মনে হয়।
এখানে দিনে ৩-৪ ঘন্টা বিভিন্ন কাজ করতে হয়। কাজগুলো একেবারে আহামরি কঠিন নয়। এর জন্য কোনো চাপ প্রয়োগও করা হয় না। আমার ভাগ্যে জুটেছে বন্দিশালার করণিকের কাজ। এভাবেই চলল প্রায় একবছর। ভাবলাম দিনগুলো তো মন্দ কাটছে না। বাকিজীবনটা এভাবেই না হয় কেটে যাক।
হঠাৎ একদিন, মধ্যাহ্নভোজ সেরে সবে লাইব্রেরিতে বসে বইয়ের পাতা উল্টোচ্ছি। এমন সময় প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দে কান ফেটে যাবার যোগাড়। সাইরেন বেজে উঠল। বুঝতে পারলাম আশেপাশেই কিছু ঘটছে।
এক দৌড়ে হলঘরে আসতেই কমান্ডার আব্দুল্লাহ ভাই বললেন:-"শিবিরে হামলা হয়েছে। আপনারা আমার সাথে দ্রুত বেরিয়ে পড়ুন। আমরা আপনাদের নিরাপদ আস্তানায় নিয়ে যাব।"
আব্দুল্লাহ ভাই কিছু না বললেও আমি বুঝতে পারলাম আমার স্বজাতি ভাইয়েরা আমাদেরকে উদ্ধারের জন্য হামলা চালিয়েছে। ওরা আমাদের চোখে কালো কাপড় বেঁধে দিল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই বাকিরা দ্রুতপদে পা চালাল।
প্রথমে কিংকর্তব্যবিমূঢ়ের মতো দাঁড়িয়ে থাকলেও ওদেরকে অনুসরণ করলাম।সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামলাম। প্রহরীরা গাড়িতে উঠাল। দীর্ঘপথ অতিক্রম করার পর গাড়ি থামল। আমাদের চোখের কাপড় খুলে দিল। অনেক রাত হয়ে গেছে। দেখলাম এক ঝোপের মাঝে দাঁড়িয়ে আছি। আশেপাশে যারা উপস্থিত তারা সবাই অচেনা। পাশেই কেউ একজন ডাল-পাতা সরিয়ে ম্যানহোলের ঢাকনা খুলল। প্রথমে ওরা কয়েকজন গর্তে ঢুকল।
আমাদের মাথায় সার্চ লাইট লাগিয়ে সেখানে প্রবেশ করতে আদেশ করল।নিচে নেমে দেখি এটা যেনতেন গর্ত নয়, সুড়ঙ্গের প্রবেশমুখ। হামাসের সশস্ত্র যোদ্ধাদের তৈরি এমন সুড়ঙ্গের কথা গুজব বলে উড়িয়ে দিয়েছি এতোদিন। আজ তা নিজে প্রত্যক্ষ করলাম। প্রায় একঘন্টা টানেলে হেঁটে যাওয়ার পর মাটির নিচে এক গোপন কক্ষে প্রবেশ করলাম। সেখানে অপরিচিত আরো শ'কতক যোদ্ধা উপস্থিত ছিল। আমরা ছিলাম মোট ৫ জন। বড় একটি কামরায় আমাদের থাকবার বন্দোবস্ত হলো। ওদের অফিস তথা কোয়ার্টারে আমাদের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। অষ্টপ্রহর তিনজন প্রহরী আমাদের নিরাপত্তায় নিযুক্ত হলো।
কয়েকদিন পর,ওদের সাথেও আমাদের সখ্যতা গড়ে ওঠে। আমাদের সম্পর্কটা এতোটাই বন্ধুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেছিল যে, আমরা একই বিছানায় ঘুমাতাম। কারণ, গোপন সুড়ঙ্গের এই কোয়ার্টারে বিছানার তুলনায় মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি। শুধু তাই নয়, আমরা একসাথে খাবার ভাগাভাগি করে খেতাম। মোটকথা, মাটির নিচের এই অন্ধকার প্রকোষ্ঠে সম্পূর্ণ অচেনা পরিবেশে আমাদের জীবনটা ভালোভাবেই কাটতে লাগল।
চার মাস সেখানে থাকার পর পুনরায় নুসাইরাত শরনার্থী শিবিরে ফিরিয়ে আনলো। এসে শুনতে পাই জিম্মিদের উদ্ধারে অভিযানের সময় ইসরায়েলি সেনাবাহিনী কমপক্ষে ২৭৬ জনকে হত্যা করে এবং হামলায় ৬৯৮ জনেরও বেশি আহত হয়।
হামলা শেষে মাত্র ৪ জন জিম্মিকে ওরা সঙ্গে করে নিয়ে যায়। এই ৪ জন জিম্মিই সেই সুপার নোভা কার্নিভালে হামাসের সেনাদের হাতে বন্দি হয়েছিল। খবর শুনে মনটা খারাপ হয়ে যায় আমার। আমি যতদুর জানি, আমাদের জায়োনিস্ট সেনারা মুসলিম জিম্মিদের সাথে খুবই খারাপ আচরণ করে। ওরা শুধু নারকীয় নির্যাতন করেই ক্ষান্ত হয় না। বিভিন্ন যৌনাত্যাচারে মেতে ওঠে জিম্মিদের সাথে। কনসেনট্রেশান ক্যাম্পে রেখে সকল প্রকার মৌলিক অধিকার খর্ব করে। দিনের পর দিন অভুক্ত রেখে নির্যাতনের স্টিম রোলার চালায়।
নির্যাতনের পৈশাচিকতা এতোটাই বিকৃত ও ভয়ানক যে, অনেকেই সহ্য করতে না পেরে শাহাদাত বরণ করে। আমরা তো এখানে দুধে-ভাতেই আছি। তারপরও ওরা এই নারকীয় তাণ্ডবলীলা চালাল কেন? জানি না কবে এই সংকটের নিরসন ঘটবে।
ফিরে আসার পর এখানে আমাদের কদর ও গ্রহণযোগ্যতা দুটোই বেড়েছে। হলঘরটি গুড়িয়ে যাওয়ার কারণে প্রত্যেকের জন্য একক কক্ষ বরাদ্দ হলো। কক্ষগুলোর সাথে লাগোয়া বাথরুম ও ব্যালকনি। আশেপাশে কোন প্রহরী থাকে না। শুধুমাত্র সিঁড়ির প্রবেশমুখে একজন প্রহরী রাতেরবেলায় পায়চারি করে। কমান্ডারসহ সকল প্রহরীদের সাথে আমাদের খুব ভালো সময় কাটে। সপ্তাহে একদিন সবাই মিলে চুটিয়ে আড্ডা দেই। অর্থনৈতিক মন্দার কারণে খাবারের সংকট দেখা দিলেও সবারই সেটা সয়ে গেছে। বেশ ভালোই কাটছে দিনগুলো।
হঠাৎ, কাল রাতে আব্দুল্লাহ ভাই এসে বলে গেল, ইহুদি সরকার বন্দি বিনিময় চুক্তিতে রাজি হয়েছে। আমাদের ৫ জনের বিনিময়ে প্রশাসন ৩০০ জন হামাস জিম্মিকে মুক্তি দেবে। এটা অবশ্যই আনন্দের সংবাদ। তিনি আমাকে সকালবেলা ঘুম থেকে ওঠেই প্রস্তুত হতে বললেন। আমি তাই করলাম।
হামাসের কাসসাম ব্রিগেডের সদস্যরা এসে পড়েছে। আমরা মঞ্চে উঠলাম। বিশ্ব-গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা সামনে দাঁড়িয়ে নিউজ কাভার করতে শুরু করল। একে একে প্রহরীরাও মঞ্চে উঠলেন। ক্যামেরার ফ্ল্যাশ লাইটের ঝলকানিতে চোখ ধাঁধিয়ে যায়। চারিদিকে হামাস যোদ্ধা ও শরণার্থী শিবিরের আশ্রিতদের জনস্রোত। মুক্তি?
হ্যাঁ, মুক্তি। মুক্তি পেলাম এই বন্দিশিবির হতে। কিন্তু, আমরা তো এখানে বন্দি ছিলাম না। আবদ্ধ কামরায় সাধারণভাবেই বসবাস করতাম। সবকিছু আমাদের আয়ত্তেই ছিল। ওরা তো আমাদের ওপর জোর জবরদস্তি খাটায়নি বরং ভাইয়ের মতো আচরণ করেছে।
ভিড় ঠেলে আব্দুল্লাহ ভাই এসে মঞ্চে ওঠলেন। আমার ব্যক্তিগত প্রহরী সোহরাব ভাইও আমার পাশে এসে দাঁড়ালেন। পরম আবেগে আমার হৃদয় সিক্ত হলো। সমবেত জনতার দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে হাত নাড়তে লাগলাম। আমি কান্না ধরে রাখতে পারছি না। এটা দুঃখের নয়, অচেনা এক সুখের ক্রন্দন। সোহরাব ভাই আমার কাঁধে হাত রাখতেই আমি ওনাকে জড়িয়ে ধরলাম। মুখোশ আবৃত কপালে পরম ভালোবাসায় চুমু খেলাম। এই শরণার্থী শিবির ছেড়ে যেতে খুবই কষ্ট হচ্ছে আমার। আর কি কখনো ফিরতে পারব মায়াজালে ঘেরা এই শিবিরে??
কতোই না স্মৃতি বিজড়িত এই মঞ্জিল। যা আমার মানসপটে অক্ষত থাকবে আমৃত্যু। কখনো ভুলবো না আমি। রেডক্রসের গাড়ির হর্ণে সম্বিত ফিরে পেলাম। আব্দুল্লাহ ভাই মঞ্চ থেকে নামতে ঈশারা করলেন। ওনার হাত ধরে সম্মুখের মাঠ পেরিয়ে প্রধান ফটকে উপস্থিত হলাম। উনি গাড়ির দরজা খুলে দিলেন। উঠে বসলাম। সোহরাব ভাইসহ বাকিরা হাত নাড়ছে।
সবার চোখেই অশ্রু। গাড়ি চলতে শুরু করল। যতক্ষণ পর্যন্ত নুসাইরাত শরনার্থী শিবিরের অর্ধ ভগ্ন ভবনগুলো আমার দৃষ্টি সীমানায় বিরাজ করল, ততক্ষণই আমি শোকপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম। আজ এই ফিলিস্তিনের মাটিতে এক ধ্রুব সত্যময় ইতিহাসের সাক্ষী হলাম। যে ইতিহাসকে সারা বিশ্বের মানুষের কাছে গোপন রেখেছে আমাদের ইহুদি প্রশাসন। ওদের ভূখণ্ডে এসে ওদেরই অমানবিক নির্যাতনের ফাঁদে ফেলে বাস্তুচ্যুত করার মহোৎসবে মেতে ওঠেছি আমরা। তবুও, আমাদের প্রতি ওরা কতোই না সদয়। আমরা জায়নাবাদীরা অ্যানা ফ্রাঙ্কের ডাইরি দেখিয়ে বিশ্বের বুকে মানবতার মিথ্যে বুলি ফুটিয়ে মায়াকান্না করি। কিন্তু, আধিপত্যবাদের নগ্ন ক্রীড়ায় মত্ত হয়ে আ্যানা ফ্রাঙ্কের মতো লক্ষ লক্ষ শিশুকে হত্যা করছি।
আসলে, এটা আমাদের ভীমরতি ছাড়া কিছুই নয়। জানি ইসরায়েলে পোঁছার পর প্রশাসন আমাকে মিডিয়ার মুখোমুখি হতে দেবে না। কারণ, ওরা সত্য নয় মিথ্যার পূজারী।
মুসলিমদের প্রকৃত স্বরুপ যদি আমার মাধ্যমে মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়, তাহলে ওদের মুখোশ উন্মোচিত হবে। কিন্তু, আমি নিজ চক্ষু দিয়ে দেখেছি মুসলমানরা কতোই না সদয়।
আজ আমার স্বজাতির সস্তা ও বিকৃত ইতিহাসকে পদদলিত করে প্রকৃত ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে রইলাম। আমি ওদের মতোই এক পাপী ইহুদি। তোমরা আমার নামটি মনে রেখো। আমার নাম ওমর শেম টভ। আমি এতোদিন জিম্মি ছিলাম না। এই সুখের নিবাসকে আমি বন্দিদশা বলতে পারি না। কিন্তু আজ হতে আমি জিম্মি হলাম। লক্ষ ফিলিস্তিনিদের হত্যা করে যে দায় আমরা এড়াতে পারিনি। সেই দায়ের নিকট নতুনভাবে আমৃত্যু জিম্মি হয়ে রইলাম।