শনিবার ২০ জুন ২০২৬, ৬ আষাঢ় ১৪৩৩
প্রকাশিত: ২০২৬-০৬-২০ ২০:০৬:১৬
মধুপুর (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি:
টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলায় একটি ছাগলের বাচ্চা উদ্ধার করতে গিয়ে পরিত্যক্ত কূপে নেমে একই পরিবারের চারজনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।
আজ শনিবার (২০ জুন, ২০২৬) সকালে উপজেলার টেলকি গ্রামে ঘটে যাওয়া এই হৃদয়বিদারক ঘটনায় পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। নিহতদের মধ্যে বাবা-ছেলেও রয়েছেন।
নিহতরা হলেন— টেলকি গ্রামের বাবুল হাদিমা, তার শিশু ছেলে নেইমার ম্রং, একই গ্রামের রতন নকরেক এবং গাবরিয়েল নকরেক।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সকালে বাবুল হাদিমার একটি ছাগলের বাচ্চা বাড়ির পাশে থাকা একটি পরিত্যক্ত কূপে পড়ে যায়। ছাগলটিকে উদ্ধারের জন্য প্রথমে কূপে নামে তার শিশু ছেলে নেইমার ম্রং। কিছুক্ষণ পরেও সে উপরে না উঠলে এবং কোনো সাড়া-শব্দ না পাওয়া গেলে উদ্বিগ্ন হয়ে তার বাবা বাবুল হাদিমা কূপে নামেন।
কিন্তু তিনিও দীর্ঘ সময় ধরে উপরে ফিরে না আসায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। এরপর তাদের উদ্ধারের জন্য একে একে গাবরিয়েল নকরেক ও রতন নকরেক কূপে নামেন। কিন্তু তারাও আর ফিরে আসেননি। এতে ঘটনাস্থলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং স্থানীয়রা দ্রুত ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশকে খবর দেন।
খবর পেয়ে মধুপুর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। কূপটির ভেতরে অক্সিজেনের ঘাটতি থাকায় উদ্ধারকাজে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। পরে ফায়ার ফাইটাররা একে একে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করেন।
মধুপুর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহকারী স্টেশন কর্মকর্তা লাভলু তরফদার ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, পরিত্যক্ত কূপে পড়ে যাওয়া একটি ছাগলের বাচ্চা উদ্ধারের সময় প্রথমে এক শিশু কূপে নামে। ধারণা করা হচ্ছে, কূপের ভেতরে পর্যাপ্ত অক্সিজেন না থাকায় সে অজ্ঞান হয়ে পড়ে এবং পরে মারা যায়। তাকে উদ্ধারের জন্য পর্যায়ক্রমে আরও তিনজন কূপে নামলেও তারাও অক্সিজেনের অভাবে প্রাণ হারান।
তিনি আরও জানান, কূপটির গভীরতা আনুমানিক ৯ থেকে ১০ ফুট। উদ্ধার অভিযান শেষে মরদেহগুলো স্থানীয় পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে বাবা-ছেলে রয়েছেন এবং অপর দুইজন তাদের নিকট আত্মীয় বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।
এদিকে, একসঙ্গে চারজনের মৃত্যুর ঘটনায় টেলকি গ্রামজুড়ে নেমে এসেছে শোকের মাতম। নিহতদের স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে গ্রামের পরিবেশ। প্রতিবেশীরা জানান, মুহূর্তের মধ্যে ঘটে যাওয়া এই দুর্ঘটনা কেউ কল্পনাও করতে পারেননি।
স্থানীয় প্রশাসন ও ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তারা পরিত্যক্ত কূপ, ট্যাংক বা বদ্ধ স্থানে অক্সিজেনের ঘাটতি এবং বিষাক্ত গ্যাসের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের স্থানে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও প্রশিক্ষণ ছাড়া প্রবেশ করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং প্রাণঘাতী হতে পারে।
মধুপুর থানার পুলিশ জানিয়েছে, প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া শেষে মরদেহগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে। একই সঙ্গে দুর্ঘটনার সার্বিক বিষয় তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
একটি ছাগলের বাচ্চা উদ্ধারের চেষ্টা যে একই পরিবারের চারটি প্রাণ কেড়ে নেবে, এমন নির্মম পরিণতি কল্পনাও করতে পারেনি কেউ। টেলকি গ্রামের মানুষের কাছে দিনটি তাই হয়ে থাকবে এক শোকাবহ স্মৃতি।