মঙ্গলবার ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪ আশ্বিন ১৪৩৩
প্রকাশিত: ২০২৬-০৯-২৯ ২৩:১৬:০৬
নিজস্ব প্রতিনিধি:
টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে লিফট-বিড়ম্বনা ও চরম জনবল সংকটে চিকিৎসা সেবা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। হাসপাতালের জন্য বরাদ্দকৃত ১২টি লিফটের মধ্যে ৫টিই দীর্ঘদিন ধরে বিকল রয়েছে। ফলে রোগী ও তাদের স্বজনদের পোহাতে হচ্ছে চরম দুর্ভোগ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে লিফটের অপেক্ষায় মেঝেতেই ঢলে পড়ছেন মুমূর্ষু রোগীরা।
বিশেষ করে গুরুতর অসুস্থ, অস্ত্রোপচার-পরবর্তী রোগী, ও হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীদের জন্য এই লিফট বিরম্বনা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। এদিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ লিফট বিকল থাকার বিষয়টি গণপূর্ত বিভাগের গাফলতির কারণ বলে জানাচ্ছেন।
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) সকালে ১১টার দিকে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের প্রথম তলায় লিফটগুলোর সামনে রোগী ও স্বজনদের দীর্ঘ লাইন। তাদের মধ্যেই দাঁড়িয়ে আছেন কয়েকজন মুমূর্ষু রোগী। বেলা সাড়ে ১১টায় হাসপাতালের ৫ম তলায় দেখা যায় রেডিওলজি বিভাগে ডাক্তার দেখিয়ে নিচে নামার জন্য লিফটের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে জ্ঞান হারিয়ে মেঝেতে পড়ে রয়েছেন শম্ভুনাথ পাল নামের এক গুরুতর অসুস্থ রোগী।
তার স্বজনরা পাশে বসে খবরের কাগজ দিয়ে বাতাস করে তাকে জ্ঞান ফেরানোর চেষ্টা করছেন। রোগীর স্বজনরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, লিফটের অতিরিক্ত ভিড় ও লম্বা লাইনের কারণে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। ফারুক হোসেন, ও সালমা বেগম নামের কয়েকজন ভুক্তভোগী জানান, আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও লিফটে ওঠার উপায় নেই।
জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা এক রোগীর স্বজন আক্ষেপ করে বলেন, "আজকে আমার মায়ের যদি গুরুতর কিছু হয়, তবে তার জন্য এই লিফটের অব্যবস্থাপনাই দায়ী থাকবে।" অপর এক রোগী সকাল ১০টায় এসেও লিফটের জটের কারণে বেলা ২টা পর্যন্ত চিকিৎসকের দেখা পাননি। আনিসুর রহমান নামে একজন রোগীর বলেন, হাসপাতালে মানুষ আসে চিকিৎসা পেয়ে সুস্থ হতে, কিন্তু এখানকার এই লিফটের জটলা আর ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থেকে সুস্থ মানুষও আরও বেশি অসুস্থ হয়ে পড়বে। আমরা তো আর শখ করে হাসপাতালে আসি না।
১২টা লিফটের মধ্যে ৫টাই নাকি বন্ধ। এটা কেমন ধরনের অবহেলা? কর্তৃপক্ষ এক পক্ষ অপর পক্ষকে দোষ দিচ্ছে, আর মাঝখান থেকে আমাদের মতো সাধারণ রোগীদের জীবন নিয়ে টানাটানি চলছে।"
২০১৪ সালে স্থাপিত উন্নত অবকাঠামো ও আধুনিক সুবিধা সংবলিত এই হাসপাতালটিতে সেবা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। চিকিৎসক ও কর্মীদের অনুপস্থিতি, তীব্র জনবল সংকট, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ঘাটতি এবং অবকাঠামোগত সমস্যা নিত্যদিনের চিত্র। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা যায়, ৫০০ শয্যার এই হাসপাতালে বর্তমানে রোগী ভর্তি রয়েছেন ৮৪০ জন। কিন্তু বিশাল এই বহর সামলাতে অনুমোদিত ৭৪০ জন চিকিৎসক, নার্স ও স্টাফের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ৩২২ জন।
অপ্রতুল জনবল নিয়ে অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। লিফট বিকল থাকা ও অব্যবস্থাপনার বিষয়ে হাসপাতালের পরিচালক ডা. মো. আব্দুল কুদ্দুস জানান, ১২টির মধ্যে ৫টি লিফট নষ্ট থাকায় রোগীদের কষ্ট হচ্ছে। তবে লিফট রক্ষণাবেক্ষণের পুরো দায়িত্ব গণপূর্ত বিভাগের। গণপূর্ত বিভাগ 'ওটিজ' ও 'ক্রিয়েটিভ' নামের দুটি কোম্পানির মাধ্যমে সারাবছর এগুলো দেখভাল করে। পরিচালক বলেন, "আমরা গণপূর্ত বিভাগকে বারবার চিঠি দেওয়া সত্ত্বেও তারা কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। হাসপাতালে সব কেনাকাটা ইজিপি টেন্ডারের মাধ্যমে হয়, এতে আমাদের কোনো হাত নেই। এ ছাড়া ৭৪০ জনের জায়গায় মাত্র ৩২২ জন জনবল নিয়ে সেবা দিতে আমাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।"
অন্যদিকে গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী শম্ভুরাম পাল গাফিলতির কথা অস্বীকার করে বলেন, "১২টির মধ্যে ৭টি চালু আছে, ৫টি বিকল। নষ্ট লিফটগুলোর পার্টস বেশ দামি এবং এগুলো টাঙ্গাইলে পাওয়া যায় না, ঢাকা থেকে আনতে হবে। আমরা অলরেডি লিফট সরবরাহকারী কোম্পানিকে জানিয়েছি।" রক্ষণাবেক্ষণ বাজেটের অপ্রতুলতার কথা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, "১২টি লিফটের বাৎসরিক রক্ষণাবেক্ষণ বাজেট মাত্র ১২ লাখ টাকা, যা নিতান্তই কম। তবে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বাকি ৫টি লিফট চালু করতে আমাদের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।"