শুক্রবার ২৪ এপ্রিল ২০২৬, ১১ বৈশাখ ১৪৩৩

Logo
Add Image

জেলা খবর

যশোরে বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও জ্বালানি সংকট: ইরি-বোরো মৌসুমে দিশেহারা কৃষক

প্রকাশিত: ২০২৬-০৪-২৩ ১৯:০৯:৩৯

News Image

উবাঈদুল হুসাইন আল্ সামি, যশোর প্রতিনিধি: 
যশোরের দিগন্তজোড়া মাঠে এখন সোনালী স্বপ্নের হাতছানি। ইরি-বোরো মৌসুমের শেষ পর্যায়ে এসে ধানের শীষে দুধল দানা কেবল পুষ্ট হতে শুরু করেছে। এই সময়ে ফসলের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন সেচ। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে, ঠিক এই সংকটকালেই দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এই কৃষি প্রধান জেলায় জেঁকে বসেছে তীব্র বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং জ্বালানি তেলের সংকট। একদিকে প্রচণ্ড দাবদাহ, অন্যদিকে সেচ সংকটে মাঠের ফসল রোদে পুড়ে চৌচির হওয়ার উপক্রম। শেষ মুহূর্তে এসে ফলন বিপর্যয়ের শঙ্কায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন যশোরের হাজার হাজার কৃষক।

 

যশোর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোশাররফ হোসেন বলেন,"চলতি মৌসুমে জেলাতে ১ লক্ষ ৫৭ হাজার ৯৫০ হেক্টর জমিতে ইরি-বোরো চাষ হয়েছে। জেলাতে মোট বিদ্যুৎ ও ডিজেল চালিত ছোট বড় ৬৩ হাজারের বেশি সেচ পাম্প রয়েছে। ফলনও বেশ ভালো কিন্তু কিছু উপজেলায় ৫% ফসল কাটা হলেও বেশিরভাগ উপজেলায় এখনো দশ, পনের দিন পরে ধান কাটা শুরু হবে। এই মুহূর্তে আরও দুই একটি সেচের প্রয়োজন হবে। তবে আশা করছি বৈশ্বিক যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকট ও লোডশেডিং সমস্যা তৈরি হয়েছে সেটার প্রভাব পড়ছে না ও কৃষি সেচের সমস্যা হবে না।"। 

 

সরেজমিন দেখা যায় কৃষকদের দাবি ভিন্ন, তারা বলছে, "গত দুই সপ্তাহ ধরে দিনে ও রাতে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে লোডশেডিং চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে ১০-১২ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ থাকছে না। বিশেষ করে গভীর রাতে যখন সেচ পাম্পগুলো চালানোর কথা, তখনই দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকছে গ্রামাঞ্চলে।

 

চৌগাছা উপজেলার কৃষক আলী কদর আক্ষেপ করে বলেন,'"ধানের শীষ কেবল বের হইছে। এই সময় মাটি শুকায়ে গেলে চাল হবে না, ধান সব চিটা হয়ে যাবে। সারারাত পাম্পের গোড়ায় বসে থাকি বিদ্যুতের আশায়, কিন্তু দেখা নাই। যখন আসে, তখন ভোল্টেজ এতো কম যে পানি ঠিকমতো উঠে না।"

 

একই এলাকার কৃষক ও পানি ব্যবসায়ী হাবিবুর রহমান বলেন,"আমার দুই গভীর নলকূপ, বিদ্যুৎ আসে আর যায়। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১০ ঘণ্টাও ঠিকমতো বিদ্যুৎ  থাকে না। যখন আসে, তখন ভোল্টেজ এতো কম থাকে যে মোটরের কয়েল পুড়ে যাওয়ার ভয়ে পাম্প ছাড়তে পারি না। মাঠের কৃষকরা পানির জন্য প্রতিদিন আমার বাড়িতে এসে ভিড় করছে, গালিগালাজ করছে। কিন্তু বিদ্যুৎ না থাকলে আমি পানি দেবো কোত্থেকে?"

 

তিনি আরও জানান, বিদ্যুতের অভাবে পাম্প না চললেও মাস শেষে ঠিকই বড় অঙ্কের বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে। অন্যদিকে, ডিজেল দিয়ে পাম্প চালাতে গেলে উৎপাদন খরচ দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে, যা কৃষকরা দিতে রাজি নন। এই অবস্থা চলতে থাকলে কয়েক লাখ টাকা লোকসান দিয়ে তাকে পানি ব্যবসা বন্ধ করে দিতে হবে। এ যেন মরার উপর খাঁড়ার ঘা"

 

বিদ্যুৎ না থাকায় কৃষকরা বিকল্প হিসেবে ডিজেলচালিত সেচ পাম্পের দিকে ঝুঁকলেও সেখানেও বিপত্তি। বৈশ্বিক যুদ্ধের কারণে যশোরের স্থানীয় বাজারগুলোতে ডিজেলের তীব্র সংকট রয়েছে। পাম্প গুলোতে দীর্ঘ লাইন দিয়েও চাহিদামতো তেল পাচ্ছেন না চাষীরা। অনেকে বাধ্য হয়ে ড্রামপ্রতি চড়া দাম দিয়ে কালোবাজার থেকে তেল কিনছেন।

 

শার্শা ও ঝিকরগাছা উপজেলার বিভিন্ন ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা গেছে, ‘তেল নেই’ সাইনবোর্ড ঝুলছে। কৃষকদের দীর্ঘ লাইন থাকলেও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত জ্বালানি। বৈশ্বিক যুদ্ধের পরিস্থিতির কারণ ও সরবরাহ ঘাটতির অজুহাত দেখাচ্ছেন পাম্প মালিকরা। প্রতি লিটার ডিজেলে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ২০ থেকে ২৫ টাকা বেশি গুনতে হচ্ছে প্রান্তিক কৃষকদের। এতে উৎপাদন খরচ এক লাফে অনেকটা বেড়ে যাওয়ায় লাভের বদলে লোকসানের আশঙ্কায় ভুগছেন তারা।

 

এ বছর এপ্রিলের শুরু থেকেই যশোর অঞ্চলের ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে মাঝারি থেকে তীব্র তাপপ্রবাহ। তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যাওয়ায় মাঠের পানি দ্রুত শুকিয়ে যাচ্ছে। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, বোরো ধানের এই পর্যায়ে জমিতে অন্তত ২-৩ ইঞ্চি পানি থাকা বাধ্যতামূলক। পানি না থাকলে ধানের দানা পুষ্ট হবে না এবং 'হিট শক'-এর কারণে ধান নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।

 

যশোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর জেনারেল ম্যানেজার মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান খান বলেন," বর্তমান কৃষকদের সেচ চাহিদার বিপরীতে আমরা বিদ্যুৎ সরবরাহ নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে দিতে পারছিনা, কখনো রেশনিং পদ্ধতিতে লোডশেডিং করে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে হবে হচ্ছে।


আমরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। বিদ্যুৎ বিভাগকে সেচ কাজে অগ্রাধিকার দেওয়ার জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছে। কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে যাতে তারা রোদ কম থাকলে অর্থাৎ বিকেলে বা ভোরে সেচ দেন। তবে জ্বালানি ও বিদ্যুতের বর্তমান সংকটে কৃষকরা যে চাপে আছেন, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।"যশোর জেলা মোট বিদ্যুৎ চালিত ত্রিশ হাজারের উর্ধে গভীর, অগভীর ও ললিত পাম্প রয়েছে, আমরা চেষ্টা করছি সরবরাহ অনুযায়ী অগ্রধিকার ভিত্তিতে গ্রামীণ পর্যায়ে কৃষকের সেচ বিদ্যুৎ সরবরাহ করার।"

 

কর্মকর্তাদের দাবি, গ্রিড থেকে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অনেক কম পাওয়া যাচ্ছে। ফলে রেশনিং করে লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। তবে কৃষকদের অভিযোগ, সেচ মৌসুমে কৃষি ফিডারগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দেওয়ার সরকারি প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন নেই।

 

যশোরকে বলা হয় দেশের শস্যভাণ্ডার বা হাব। এখান থেকে উৎপাদিত ধান দেশের একটি বড় অংশের চালের চাহিদা মেটায়। কিন্তু মৌসুমের শেষ পর্যায়ে এসে জ্বালানি আর বিদ্যুতের এই হাহাকার কেবল কৃষকের ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, বরং জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।

 

কৃষকদের দাবি, দ্রুততম সময়ের মধ্যে গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিং বন্ধ করতে হবে এবং ডিজেল সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে মাঠের পাকা ধানের বদলে কেবল খড় নিয়ে ঘরে ফিরতে হবে তাদের। সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে কৃষি নির্ভর এই অঞ্চলের অর্থনীতি বড় ধরনের বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে।

 

সবুজে ঘেরা মাঠের সোনালী স্বপ্নগুলো কি তবে বিদ্যুৎ আর তেলের অভাবে ফিকে হয়ে যাবে? এই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে যশোরের প্রতিটি কৃষক পরিবারের মনে।
 

Logo
Logo





Logo

আরো পড়ুন

Logo

সম্পাদক : আবু তাহের

© ২০১৪-২০২৬ টাঙ্গাইল দর্পণ, অনলাইন নিউজ পেপার ২৪/৭