প্রিন্ট এর তারিখঃ মঙ্গলবার ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৪ ভাদ্র ১৪৩৩
প্রকাশিত: ২০২৬-০৯-০৮ ১৬:৪৮:০৭
উবাঈদুল হুসাইন আল্ সামি, যশোর প্রতিনিধি:
চৌগাছায় ৫ কাঠা জমিতে ৩০ গাছ, তিন বছর পর বাম্পার ফলন; কেজি বিক্রি হচ্ছে ৮০০–১,০০০ টাকায়
যশোরের চৌগাছা উপজেলার হিজলী গ্রামের একটি বাগানে দূর থেকে তাকালে মনে হবে গাছে ঝুলছে আপেল কিংবা পাকা গাব। কিন্তু কাছে গেলেই বদলে যায় সেই ধারণা। আপেলের মতো আকৃতি, গায়ে কমলার আভা। খেতে মিষ্টি ও রসালো—স্বাদে যেন আপেল, গাব আর খেজুরের এক অদ্ভুত মিশেল। জাপানের জনপ্রিয় ফল পার্সিমনের এমনই এক বাগান গড়ে তুলেছেন হিজলী গ্রামের কৃষক জুলফিকার সিদ্দীক।
পরীক্ষামূলকভাবে শুরু করা এই চাষে ইতোমধ্যে সফলতা পেয়েছেন তিনি। চলতি মৌসুমে তার বাগানের গাছগুলোতে এসেছে প্রচুর ফল। গাছের ডালে ডালে ঝুলছে থোকায় থোকায় পার্সিমন। নতুন এই ফলের বাম্পার ফলন দেখতে প্রতিদিনই আশপাশের এলাকা থেকে মানুষ ছুটে আসছেন। একই সঙ্গে স্থানীয় কৃষকদের মধ্যেও বাড়ছে পার্সিমন চাষের আগ্রহ।
তিন বছর পরিচর্যার পর ফলন
কৃষক জুলফিকার সিদ্দীক জানান, ২০২১ সালে নাটোর থেকে পার্সিমনের চারা সংগ্রহ করে তিনি ৫ কাঠা জমিতে ৩০টি গাছ রোপণ করেন। প্রায় তিন বছর নিয়মিত পরিচর্যার পর গাছগুলোতে ফল আসতে শুরু করে। এরপর ধীরে ধীরে ফলন বাড়তে থাকে। চলতি মৌসুমে প্রতিটি গাছেই ভালো ফলন হয়েছে।
জুলফিকার সিদ্দীক বলেন, ‘এমন একদিন আসবে, যখন পার্সিমন কাঁচাতেই মিষ্টি পাবেন। এখন এগুলো অল্প অল্প করে ফল দিতে শুরু করেছে। কৃষি বিভাগের সহযোগিতা এবং টিস্যু কালচারের মাধ্যমে চারা উৎপাদন করা গেলে এই ফলের চাষ সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব।’
নিজেও পার্সিমনের চারা উৎপাদনের কাজ করছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি চাই আমার মাধ্যমে আরও অন্তত ১০০ জন কৃষক এই চাষে আসুক। সরকার যদি প্রশিক্ষণ ও চারা সহায়তা দেয়, তাহলে তিন বছরের মধ্যে যশোরে পার্সিমনের বড় বাগান গড়ে তোলা সম্ভব।’
বাগান দেখতে ভিড়, বাড়ছে কৃষকদের আগ্রহ
জুলফিকারের বাগানে পার্সিমন ফল ধরার খবর ছড়িয়ে পড়েছে আশপাশের গ্রামগুলোতে। প্রতিদিনই নানা বয়সী মানুষ বাগানটি দেখতে আসছেন। আপেলের মতো দেখতে আকর্ষণীয় ও অপরিচিত এই ফল দেখে অনেকেই বিস্মিত হচ্ছেন। কেউ কেউ স্বাদ নিয়ে প্রশংসা করছেন, আবার অনেকে বাড়িতে চাষের জন্য চারা সংগ্রহের পরিকল্পনাও করছেন।
বাগান দেখতে আসা মনিরুজ্জামান বলেন, ‘জীবনে অনেক ধরনের ফল দেখেছি, কিন্তু এই ফলটি দেখতে যেমন সুন্দর, খেতেও তেমন সুস্বাদু। গাছে কুলের মতো ফল ধরে, দৃশ্যটি দেখলেই ভালো লাগে। জাপানের এই ফল দেশে উৎপাদিত হয়ে খেতে পারা আমাদের জন্য আনন্দের।’
স্থানীয়দের মধ্যে পার্সিমন নিয়ে আগ্রহ বাড়ায় এটিকে ঘিরে ভবিষ্যতে নতুন উদ্যোক্তা তৈরির সম্ভাবনাও দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
কেজি ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা
কৃষি কর্মকর্তারা জানান, শুধু হিজলী নয়, যশোরের বিভিন্ন এলাকাতেও পরীক্ষামূলকভাবে পার্সিমনের চাষ হচ্ছে। বর্তমানে মানভেদে প্রতি কেজি পার্সিমন ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি হচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের মতে, ফলটি এখনো দেশের বাজারে দুর্লভ হওয়ায় এর দাম তুলনামূলক বেশি। বাজারে চাহিদা থাকলেও উৎপাদন ও সরবরাহ কম। পাশাপাশি স্বাদ, আকর্ষণীয় চেহারা ও পুষ্টিগুণের কারণে শহরের ক্রেতাদের মধ্যে পার্সিমনের জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়ছে।
কৃষি বিভাগের চোখে নতুন অর্থকরী ফসলের সম্ভাবনা
চৌগাছা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মুশাব্বির হোসাইন বলেন, ‘এখন পর্যন্ত একজন কৃষক পার্সিমন চাষ করেছেন এবং তিনি মোটামুটি সফল হয়েছেন। আমাদের গবেষণা ও লিংকেজ ওয়ার্কশপে বিষয়টি উপস্থাপন করা হয়েছে। সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে অনুমোদন পাওয়া গেলে পার্সিমন নিয়ে আরও বিস্তারিতভাবে কাজ করার সুযোগ তৈরি হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই ফলের নতুন করে বাজার সৃষ্টি করা গেলে এবং কৃষকদের মধ্যে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করা সম্ভব হলে স্ট্রবেরি বা ড্রাগন ফ্রুটের মতো পার্সিমন চাষেও বিপ্লব ঘটতে পারে। যশোরের মাটি সবজি চাষের জন্য বিখ্যাত। একই সঙ্গে এখানকার বিভিন্ন এলাকায় ফল চাষেরও ভালো সম্ভাবনা রয়েছে।’
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, পার্সিমন চাষে আলাদা কোনো জটিল প্রযুক্তির প্রয়োজন নেই। সাধারণ ফলের বাগানের মতোই পরিচর্যা করলেই ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব। তবে উপযুক্ত জাত নির্বাচন এবং সঠিক সময়ে গাছের ছাঁটাইয়ের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
পুষ্টিগুণেও সমৃদ্ধ
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. তানভীর ইসলাম বলেন, পার্সিমনে ভিটামিন এ, ভিটামিন সি, আয়রন, পটাশিয়াম ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে। ফাইবারের পরিমাণও উল্লেখযোগ্য।
তিনি বলেন, ‘পার্সিমন নিয়মিত খাদ্যতালিকায় রাখলে শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান পাওয়া যায়। এটি চোখ ও ত্বকের জন্য উপকারী এবং ফাইবার থাকায় হজমেও সহায়তা করে। জাপান, কোরিয়া ও চীনে ফলটি অত্যন্ত জনপ্রিয়। বাংলাদেশেও ধীরে ধীরে এর গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হবে বলে আশা করা যায়।’
পার্সিমনের জাত সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এ ফলের প্রধানত দুই ধরনের জাত রয়েছে। একটি পাকলে নরম হয়ে যায়, অন্যটি কচকচে অবস্থাতেও খাওয়া যায়। বাংলাদেশে বর্তমানে যে জাতটি চাষ হচ্ছে, সেটি পাকলে নরম ও রসালো হয়।’
যশোরের মাটিতে সম্ভাবনা দেখছেন বিশেষজ্ঞরা
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, পার্সিমন তুলনামূলকভাবে খরা সহনশীল এবং অতিরিক্ত পানি জমে থাকা সহ্য করতে পারে না। তাই উঁচু জমি ও ভালো পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা রয়েছে—এমন জমি পার্সিমন চাষের জন্য বেশি উপযোগী। যশোরের অনেক এলাকায় এ ধরনের জমি থাকায় ফলটির বাণিজ্যিক চাষের সম্ভাবনা রয়েছে।
এ ছাড়া পার্সিমন গাছে রোগবালাই তুলনামূলক কম এবং অন্যান্য অনেক ফলের তুলনায় কীটনাশকের ব্যবহারও কম প্রয়োজন হতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, স্ট্রবেরি, ড্রাগন ফ্রুট ও অ্যাভোকাডোর মতো পার্সিমনও ভবিষ্যতে যশোরের একটি সম্ভাবনাময় অর্থকরী ফসল হয়ে উঠতে পারে। একটি গাছ রোপণের পর দীর্ঘ সময়—প্রায় ২০ থেকে ২৫ বছর পর্যন্ত—ফলন দেওয়ার সম্ভাবনা থাকায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হিসেবেও এটি কৃষকদের জন্য আকর্ষণীয় হতে পারে।
হিজলী গ্রামের জুলফিকার সিদ্দীকের ছোট পরিসরের উদ্যোগ তাই শুধু একটি নতুন ফলের চাষ নয়; স্থানীয় কৃষকদের জন্য এটি হয়ে উঠতে পারে নতুন সম্ভাবনার দ্বার। প্রয়োজনীয় গবেষণা, মানসম্মত চারা উৎপাদন, কৃষক প্রশিক্ষণ ও বাজার সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া গেলে যশোরের মাটিতে পার্সিমন চাষ ভবিষ্যতে বাণিজ্যিক রূপ পেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।