প্রিন্ট এর তারিখঃ মঙ্গলবার ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৬ ভাদ্র ১৪৩৩


জেলা খবর

যশোর জেলায় অস্তিত্বহীন পাঠাগারে সরকারি অনুদান, বঞ্চিত প্রকৃত পাঠাগার

প্রকাশিত: ২০২৬-০৮-৩১ ২২:৪৯:২২

News Image

উবাঈদুল হুসাইন আল্ সামি, যশোর প্রতিনিধি:
বইয়ের আলো ছড়ানোর কথা যে পাঠাগারগুলোর, সেগুলোই আজ বঞ্চনার অন্ধকারে। আর কাগজে-কলমে তৈরি "ভূতুড়ে" পাঠাগারগুলো ঠিকই সরকারি অনুদানের টাকা পকেটে পুরছে। যশোর জেলায় এমনই চিত্র এখন স্পষ্ট। 

 

উপজেলা গুলির নিভৃত গ্রামে কাগজে-কলমে চলছে একটি পাঠাগার। ২০১৮ সাল থেকে টানা ২০২৬ সাল পর্যন্ত নিয়মিত পেয়ে আসছে সরকারি অর্থ ও বইয়ের অনুদান। অথচ বাস্তবে সেটির কোনো সাইনবোর্ড নেই, নেই কোনো ভবন বা বইয়ের তাক। এমনকি স্থানীয় ইউপি সদস্য কিংবা প্রতিবেশীরাও জানেন না এমন কোনো পাঠাগারের অস্তিত্বের কথা। 

 

যশোরের চৌগাছা উপজেলার 'হাউলি যুব গ্রন্থাগার'-এর এই চিত্রের মতোই জেলাজুড়ে ভুয়া ও অস্তিত্বহীন পাঠাগার তৈরি করে সরকারি অনুদান আত্মসাৎ করছে একশ্রেণির অসাধু চক্র। অন্যদিকে, বহু বছরের পুরোনো, সমৃদ্ধ ও সক্রিয় পাঠাগারগুলো সরকারি বরাদ্দ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে কিংবা বছরের পর বছর ধর্ণা দিয়ে ঘুরছে।

 

যশোর জেলার আটটি উপজেলায় সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়, গ্রন্থ কেন্দ্র, গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তর এবং যশোর জেলা সরকারি গণগ্রন্থাগার কর্তৃক নিবন্ধিত বা তালিকাভুক্ত বেসরকারি পাঠাগারের মোট সংখ্যা ৬২টি। 

 

উপজেলাভিত্তিক হিসাব: চৌগাছায় ১৫টি, যশোর সদরে ১২টি, অভয়নগরে ৯টি, মনিরামপুরে ৬টি, বাঘারপাড়ায় ৫টি, শার্শায় ৪টি, কেশবপুরে ৩টি এবং ঝিকরগাছায় ২টি নিবন্ধিত পাঠাগার রয়েছে। এছাড়া জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের মাধ্যমে নতুন করে নিবন্ধনের প্রক্রিয়াও চালু রয়েছে।

 

নিয়ম অনুযায়ী, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র দেশের নিবন্ধিত বেসরকারি গ্রন্থাগারগুলোর সক্ষমতা, কার্যক্রম ও বই সংগ্রহের ওপর ভিত্তি করে প্রধানত তিনটি ক্যাটাগরিতে বার্ষিক অনুদান বিতরণ করে:  
'ক' ক্যাটাগরি: অপেক্ষাকৃত বড় এবং নিয়মিত বেশি পাঠক ও বইয়ের সংগ্রহ থাকা পাঠাগার।  
'খ' ক্যাটাগরি: মাঝারি আকারের এবং নিয়মিত সামাজিক-সাংস্কৃতিক কার্যক্রম পরিচালনা করা পাঠাগার।  
'গ' ক্যাটাগরি: তুলনামূলকভাবে ছোট বা নতুন নিবন্ধিত গ্রামীণ ও মফস্বল পর্যায়ের পাঠাগার।  

 

এছাড়া বিশেষ বিবেচনায় কিছু পাঠাগারকে 'বিশেষ কোটা'র আওতায় অনুদান দেওয়া হয়। বরাদ্দের নিয়ম অনুযায়ী, মোট অনুদানের ৫০ শতাংশ দেওয়া হয় নগদ অর্থ হিসেবে যা মেরামত, আসবাবপত্র ও আনুষঙ্গিক খরচে ব্যবহার্য। বাকি ৫০ শতাংশ সমমূল্যের বই হিসেবে সরবরাহ করা হয়। প্রতি বছর অনলাইনে আবেদনের মাধ্যমে এটি বরাদ্দ দেওয়া হয়।

 

২০২৫-২০২৬ অর্থ বছরে যশোর জেলা থেকে মোট ২১টি বেসরকারি পাঠাগার সরকারি ১২,৩৭,০০০ টাকা অনুদান পেয়েছে। এর মধ্যে নিবন্ধিত পাঠাগার ৬,৭৯,০০০ টাকা ও অনিবন্ধিত পাঠাগার ৫,৯৪,০০০ টাকা মোট বরাদ্দ পেয়েছে। 'ক' শ্রেণির ২টি পাঠাগার ৭৫,৫০০ টাকা করে, 'খ' শ্রেণির ৮টি পাঠাগার ৬৬,০০০ টাকা করে এবং 'গ' শ্রেণির ১টি পাঠাগার ৫৪,০০০ টাকা করে বরাদ্দ পেয়েছে।

 

অনুদানপ্রাপ্ত ২১টি প্রতিষ্ঠানের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে বেরিয়ে আসে এক অদ্ভুত চিত্র। অনুদান পাওয়া ২১টির মধ্যে নিবন্ধিত ও তালিকাভুক্ত পাঠাগার মাত্র ১২টি। আর বাকি ৯টি প্রতিষ্ঠানই সম্পূর্ণ অনিবন্ধিত!

 

'ক' শ্রেণির বরাদ্দ পাওয়া দুটি প্রতিষ্ঠান হলো যশোর ইনস্টিটিউট পাবলিক লাইব্রেরি ও মনিরামপুর পাবলিক লাইব্রেরি। 

 

'খ' শ্রেণির অনুদান পাওয়া পাঠাগারগুলোর মধ্যে রয়েছে মুক্তাঙ্গন গণগ্রন্থাগার, মনিরামপুর, বাংলাদেশ শিক্ষা জাদুঘর ও টিচার্স ক্লাব, যশোর সদর, ডা. আবুল কাশেম শিক্ষা ফাউন্ডেশন পাঠাগার, বাঘারপাড়া, স্বপ্নীল আইডিয়াল লাইব্রেরি, চৌগাছা, বাড়ীয়ালী যুব পাঠাগার, চৌগাছা, সেবাদান সমাজ কল্যাণ গণগ্রন্থাগার, কেশবপুর, খামার বাড়ি পাবলিক লাইব্রেরি, মনিরামপুর, সাত্তার মাস্টার গণগ্রন্থাগার, শার্শা, নিশ্চিন্তপুর পাঠাগার, শার্শা এবং রাইজ গণগ্রন্থাগার, যশোর সদর।

 

অন্যদিকে, অনিবন্ধিত হয়েও সরাসরি সরকারি 'গ' শ্রেণির অনুদান হাতিয়ে নেওয়া ৯টি পাঠাগার হলো কন্দর্পপুর গণগ্রন্থাগার, শার্শা, স্বামী বিবেকানন্দ গণপাঠাগার, মনিরামপুর, কুয়দা পাবলিক লাইব্রেরি, মনিরামপুর, আলোর পথে গণপাঠাগার, মনিরামপুর, চাঁদপাড়া গণগ্রন্থাগার, যশোর সদর, আহম্মদ স্মৃতি পাঠাগার, যশোর সদর, কবি শিমুল আজাদ গণগ্রন্থাগার, যশোর সদর, বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ আব্দুল মালেক স্মৃতি পাঠাগার, যশোর সদর এবং হাউলি যুব গ্রন্থাগার, চৌগাছা।

 

সরেজমিনে চৌগাছা উপজেলার হাউলি গ্রামে গিয়ে অনুদান পাওয়া 'হাউলি যুব গ্রন্থাগার'-এর খোঁজে নেমে মেলে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। গ্রামে পাঠাগারটির কোনো অস্তিত্বই নেই। নেই কোনো সাইনবোর্ড বা ভবন। মজনু মিয়া স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, তারা এই নামে কোনো দিন কোনো লাইব্রেরির কথা শোনেননি।

 

হাউলি যুব গ্রন্থাগারের দাবিদার সাধারণ সম্পাদক আব্দুস সালামের বাড়িতে গিয়ে লাইব্রেরিটি দেখতে চাইলে তিনি পাশেই একটি ঘর দেখিয়ে দেন। কিন্তু সেই ঘরে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে বাস করছেন বাড়ীয়ালী হাউলি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞান বিভাগের একজন শিক্ষক তিনি ও তার পরিবার। ঘরটি মূলত ভাড়া দেওয়া হয়েছে।

 

২০১৮ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত টানা সরকারি অর্থ ও বই বরাদ্দ পাওয়া এই পাঠাগারের নিজস্ব কোনো বই বা কাগজপত্রও দেখাতে পারেননি আব্দুস সালাম। তিনি সাফ জানান, "আমাদের নিজেদের তৈরি কোনো বই বা সংকলন নেই। সরকার থেকে যে বইগুলো দেওয়া হয়েছে, সেগুলোই আমাদের সংগ্রহে আছে।" তবে সেই সরকারি বইগুলো দেখতে চাওয়া হলেও তিনি তা প্রদর্শন করতে ব্যর্থ হন।

 

এ বিষয়ে স্থানীয় ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আলী কদর বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, "আমি এই ওয়ার্ডের নির্বাচিত মেম্বার। আমার এলাকায় 'হাউলি যুব গ্রন্থাগার' নামে কোনো পাঠাগার আছে বলে আমার জানা নেই। আজ সাংবাদিকদের মুখেই প্রথম এই নাম শুনলাম।"

 

যশোরের অনেক অনিবন্ধিত পাঠাগারের চিত্রই এমন। কাগজপত্রে নাম সর্বস্ব ভুয়া প্রতিষ্ঠান দেখিয়ে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা এখন এক শ্রেণির চক্রের লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে।

 

ভুয়া প্রতিষ্ঠানের রমরমা বাণিজ্যের বিপরীতে প্রকৃত ও ঐতিহ্যবাহী পাঠাগারগুলোর পথচলা চরম অবহেলা আর বঞ্চনার। 

 

একই উপজেলার পাশাপোল ইউনিয়নের বাড়ীয়ালী গ্রামে অবস্থিত 'বাড়ীয়ালী যুব পাঠাগার'। ১৯৭৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এই পাঠাগারটিতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় এক পরিপাটি, সমৃদ্ধ ও চোখ জুড়ানো পরিবেশ। অজপাড়া গাঁয়ে এমন একটি পাঠাগারের উপস্থিতি সত্যিই বিরল।

 

পাঠাগারটির সাধারণ সম্পাদক হারুন অর রশিদ মন্টু জানান, "আমাদের পাঠাগারে বর্তমানে ২২ হাজারের বেশি বইয়ের বিশাল সংগ্রহ রয়েছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় বিষয়সহ সব ধরনের বই এখানে সংরক্ষিত। দক্ষিণ এশিয়ায় পাঠাগারের ওপর ডক্টরেট ও গবেষণা করতে আসা গবেষকরাও তথ্য সংগ্রহের জন্য আমাদের এখানে আসেন। প্রতিদিন গড়ে ৩৫ থেকে ৪০ জন পাঠক এখানে বই পড়তে আসেন। নিঃসন্দেহে এটি বাংলাদেশের অন্যতম সেরা গ্রামীণ পাঠাগার।"

 

ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, "আমাদের পাঠাগারটি যোগ্যতা বিচারে 'ক' শ্রেণির হওয়ার কথা থাকলেও দীর্ঘদিন তা বিবেচনা করা হয়নি। অনেক অনিশ্চয়তা ও লড়াইয়ের পর ২০২৫ ও ২০২৬ সালে এসে আমরা সরকারি অনুদান পেয়েছি। যেখানে একটি সমৃদ্ধশালী নিবন্ধিত পাঠাগার অনুদান পেতে বছরের পর বছর অনিশ্চয়তায় ভোগে, সেখানে কোনো অস্তিত্ব না থাকা সত্ত্বেও ভুয়া পাঠাগারগুলো কোন দৈব বলে প্রতি বছর অনুদান পায়, তা আমাদের বোধগম্য নয়।"

 

বাড়ীয়ালী যুব পাঠাগারের মতো জেলার আরও অনেক পুরোনো পাঠাগার রয়েছে যারা বছরের পর বছর আবেদন করেও বরাদ্দ পায়নি। পাঠক ধরে রাখতে, বই কিনতে, ঘর ভাড়া দিতে তাদের হিমশিম খেতে হয়। অথচ সরকারি টাকা যাচ্ছে এমন প্রতিষ্ঠানে যার অস্তিত্বই নেই।

 

অস্তিত্বহীন পাঠাগারে সরকারি অনুদান পৌঁছানো এবং অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের তালিকাভুক্তির বিষয়ে যশোর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শাহরিয়ার হক বলেন, "তদন্ত সাপেক্ষে কোনো পাঠাগারের অস্তিত্ব না পাওয়া গেলে বা ভুয়া তথ্য দিয়ে অনুদান নেওয়ার প্রমাণ মিললে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকারি তহবিলের অপব্যবহার কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না।"

 

তিনি আরও বলেন, সরকারের যে কোন বিষয় এমন অনিয়ম হলে বা পরিরক্ষিত হলে আমরা তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।"

 

অন্যদিকে, যশোর জেলার সিনিয়র লাইব্রেরিয়ান তাজমুল ইসলাম বলেন, "অনুদানের জন্য প্রস্তাব বা তালিকা প্রেরণের ক্ষেত্রে মাঠ পর্যায়ের সরেজমিন প্রতিবেদন যাচাই করা করে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র। অনিবন্ধিত বা অস্তিত্বহীন কোনো প্রতিষ্ঠান কীভাবে অনুদানের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হলো, এটা সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের বিষয়। তবে নিয়মের ব্যত্যয় ঘটে থাকলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সুপারিশ জানাব।"

 

গ্রামীণ পর্যায়ে বইয়ের আলো ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যেই সরকারি এই অনুদান ব্যবস্থা। কিন্তু তদারকির অভাব ও অসাধু চক্রের প্রভাবে সেই অর্থ যদি অস্তিত্বহীন ভবনের ভাড়াটেকে লালন করে, তবে তা দেশের শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক চর্চার জন্য এক বড় হুমকি।

 

স্থানীয় শিক্ষক, লেখক ও সংস্কৃতিকর্মীরা বলছেন, প্রতি বছর বরাদ্দের আগে অবশ্যই সরেজমিন যাচাই বাধ্যতামূলক করতে হবে। নিবন্ধন, পাঠক সংখ্যা, বইয়ের তালিকা, কার্যক্রমের প্রমাণ ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান যেন অনুদান না পায়। পাশাপাশি যেসব পাঠাগার বছরের পর বছর ধরে নিয়মিত পাঠচর্চা চালিয়ে যাচ্ছে তাদের অগ্রাধিকার দিতে হবে।

 

সচেতন মহলের দাবি, দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে ভুয়া পাঠাগারগুলোর বরাদ্দ বাতিল করে প্রকৃত ও সক্রিয় পাঠাগারগুলোকে পূর্ণ সহযোগিতা প্রদান করা হোক। অন্যথায় সরকারের উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে এবং একদিন গ্রাম থেকে বইয়ের গন্ধই হারিয়ে যাবে।

 

বই পড়ার অভ্যাস টিকিয়ে রাখতে হলে অনুদান যেতে হবে সত্যিকারের পাঠাগারে, কাগজের পাঠাগারে নয়।