প্রিন্ট এর তারিখঃ রবিবার ২৬ জুলাই ২০২৬, ১১ শ্রাবণ ১৪৩৩


জেলা খবর

যশোরে দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি, বৃষ্টিতে ফসল নষ্ট হওয়ায় দিশেহারা ক্রেতা

প্রকাশিত: ২০২৬-০৭-২৬ ১৯:০৩:৫৫

News Image

উবাঈদুল হুসাইন আল্ সামি, যশোর প্রতিনিধি:
অতি বৃষ্টি ও টানা বর্ষণে প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষকদের ফসল তলিয়ে যাওয়ায় যশোরের বাজারগুলোতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম লাগামহীনভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে শাক-সবজি, মাছ ও মুরগির দাম কয়েকদিনের ব্যবধানে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। দাম বৃদ্ধির এই চাপে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষ। তবে ডাল, গরু ও খাসির মাংসের দাম তুলনামূলক অপরিবর্তিত রয়েছে।

 

রবিবার সকালে যশোরের বড় বাজার, পালবাড়ি ও তালতলা বাজার ঘুরে দেখা যায়, প্রতিটি সবজির দামেই আগুন।

 

এক সপ্তাহ আগেও যে কাঁচা মরিচের কেজি ছিল ৬০ টাকা, তা এখন বিক্রি হচ্ছে ১৫০ থেকে ২০০ টাকায়। টমেটোর কেজি ৮০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ২০০ টাকা, শসা ৪০ টাকা থেকে এক লাফে ২০০ টাকা। ৬০ টাকার বেগুন এখন ১৮০ টাকা। পটল, ঢেঁড়স, করলা, চিচিঙ্গা, ঝিঙ্গা প্রতিটি ৮০ থেকে ১০০ টাকা কেজি। আলু ২৫ টাকা, পেঁয়াজ ৫০ টাকা এবং রসুন ২০০ টাকা, শুকনা মরিচ ৪০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। 

 

লাল শাক, লাউ শাক, কলমি শাকের আঁটি ২০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৫০ টাকা। লাউ প্রতি পিস ৮০ টাকা, কুমড়া ৭০ টাকা।
যশোর বড় বাজারের সবজি বিক্রেতা আল আমিন অভি বলেন, _"মাঠের সবজি পানিতে নষ্ট হয়ে গেছে। খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাহিরের জেলা থেকেও মাল আসছে না। যা আসছে তাতে ভাড়া ও লস বেশি। তাই দাম কমানোর উপায় নাই।"

বাজারে মাছের দামও প্রায় দ্বিগুণ। রুই ৩০০ থেকে বেড়ে এখন ৩৫০ টাকা। তেলাপিয়া ১৮০ থেকে বেড়ে ২১০ টাকা। পাঙ্গাশ ১৬০ টাকা থেকে ২৮০ টাকা। চিংড়ি ৭০০ থেকে ১২০০ টাকা। আর ইলিশের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। ১ কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ১১৮০ থেকে ২২০০ টাকায়।

 

বড় বাজারের মাছ বিক্রেতা আমিনুর রহমান বলেন, "ঘের তলিয়ে গেছে। নদীর মাছও কম। তাই দাম বাড়তি। ইলিশ তো এখন শুধু স্বপ্ন।" মুরগির বাজারেও অস্থিরতা। লেয়ার মুরগি, বয়লার, পোল্ট্রি ও সোনালী মুরগির দাম কেজিতে ২৫ থেকে ৩০ টাকা বেড়েছে। বয়লার এখন ২১০ টাকা, সোনালী ৩২০ টাকা এবং লেয়ার ২৯০ টাকা কেজি।

 

বড় বাজারের মাংস বিক্রেতা সেলিম হোসেন জানান, "গরুর মাংস ৭৫০ টাকা ও খাসির মাংস ১১১০ টাকায় স্থিতিশীল আছে। খামারের ফিডের দাম না বাড়ায় মাংসের দাম বাড়েনি।"

 

দাম বাড়ার কারণে বাজার করতে এসে বিপাকে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। যশোর জেল রোডের বাসিন্দা স্বর্না বলেন, "১০০০ টাকা নিয়ে বাজারে এসেছিলাম। ৩-৪টা সবজি আর এক কেজি মাছ কিনতেই শেষ। সংসার চালানো খুব কষ্ট হয়ে যাচ্ছে।"

 

যশোর বেজপাড়ার বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন বলেন, "আগে ১০০০ টাকায় মোটামুটি সপ্তাহের বাজার হয়ে যেত। এখন ২ দিনও চলে না। সবকিছুর দাম বাড়তি। বেতন তো বাড়েনি।"

 

যশোর বারান্দীপাড়ার বাসিন্দা মুক্তার আলী বলেন, "বৃষ্টির কারণে কৃষকের ক্ষতি হয়েছে ঠিক আছে। কিন্তু ব্যবসায়ীরা সুযোগে দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। মনিটরিং নাই।"

 

দাম বৃদ্ধির কারণ হিসেবে কৃষি বিভাগ অতি বৃষ্টিকে দায়ী করছে।  যশোর কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের সিনিয়র কর্মকর্তা কিশোর কুমার শাহা বলেন, _"টানা বৃষ্টিতে যশোরের নিচু এলাকার শাক-সবজির ক্ষেত পানিতে তলিয়ে গেছে। নতুন ফসল মাঠে আসতে আরও ১৫-২০ দিন সময় লাগবে। সরবরাহ কম থাকায় দাম বেড়েছে। তবে আবহাওয়া ভালো হলে দাম কমে আসবে বলে আশা করছি।" এদিকে বাজার মনিটরিং জোরদারের কথা বলছে ভোক্তা অধিকার।

 

যশোর ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক সেলিমুজ্জামান বলেন, _"আমরা নিয়মিত বাজার তদারকি করছি। অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়ালে এবং রশিদ ছাড়া পণ্য বিক্রি করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ক্রেতাদেরও সচেতন হয়ে অভিযোগ জানানোর আহ্বান জানাই।" ব্যবসায়ী ও ক্রেতা উভয়েই বলছেন, বৃষ্টি কমে গিয়ে সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত বাজারে স্বস্তি ফিরবে না। তবে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি থাকলে অন্তত সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দাম বাড়ানো বন্ধ হবে বলে আশা করছেন যশোরবাসী।