প্রিন্ট এর তারিখঃ রবিবার ১২ জুলাই ২০২৬, ২৮ আষাঢ় ১৪৩৩
প্রকাশিত: ২০২৬-০৭-১২ ২১:২৭:৪৯
উবাঈদুল হুসাইন আল্ সামি, যশোর প্রতিনিধি:
বর্তমান দেশে চলমান দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া ও রেকর্ড ভাঙা অতিবৃষ্টির কারণে যশোরের অভয়নগর, মনিরামপুর, কেশবপুরের ভবদাহ অঞ্চলসহ আটটি উপজেলা প্লাবিত হয়েছে। বর্ষার এই মৌসুমে সৃষ্টি হয়েছে ভয়াবহ সাময়িক জলাবদ্ধতা। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন লাখো মানুষ; তলিয়ে গেছে কৃষকের স্বপ্নের ফসল ও ধানের বীজতলা। একই সাথে গোদের ওপর বিষফোড়ার মতো দেখা দিয়েছে সাপের উপদ্রব। এমন পরিস্থিতিতে রোববার সকালে জেলা প্রশাসনের আয়োজনে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে অমৃতাক্ষরে জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও আইন-শৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সভায় সভাপতিত্ব করেন যশোরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান। সভায় জুন ২০২৬ মাসের কার্যবিবরণী ও জেলার সামগ্রিক অপরাধচিত্র পর্যালোচনা ছাড়াও অতিবৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও জননিরাপত্তার বিষয়টি প্রধান আলোচনা হিসেবে উঠে আসে।
সভায় জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান জানান, বিগত দুই দিনে আবহাওয়া অফিসের তথ্য মতে যশোরে সর্বোচ্চ ১৯৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। অতিবৃষ্টির কারণে জেলার নিচু এলাকাগুলো সম্পূর্ণ পানির নিচে। কৃষকের ধানের বীজতলা, ফুলক্ষেত ও শাকসবজির মাঠের পর মাঠ মাছের ঘের প্লাবিত হয়ে মাছ ভেসে গেছে।
"ভবদাহ অঞ্চলের জলাবদ্ধতায় পানিবন্দী ও গৃহবন্দী মানুষের সহায়তায় গত দুই দিনে ২৭ টন চাল বিতরণ করা হয়েছে। অন্যান্য উপজেলাতেও চাহিদা মোতাবেক ত্রাণ বিতরণ করা হবে। চলমান এই সংকট নিরসন না হওয়া পর্যন্ত জেলার সংশ্লিষ্ট সকল সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে।"
তিনি উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষকদের পাশে সশরীরে মাঠে গিয়ে সমস্যা সমাধানের কঠোর নির্দেশ দেন।
অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে লোকালয়ে সাপের উপদ্রব বৃদ্ধি এবং গ্রামঞ্চলে সাপের কামড়ে মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে সভায় উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। সিভিল সার্জন ডা. মাসুদ রানা জানান, সরকারি বড় বরাদ্দ না থাকলেও বর্তমানে উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে একটি করে অ্যান্টিভেনম মজুদ আছে। এই সংকটের কথা বিবেচনা করে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান দুর্যোগকালীন বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেগুলোতে অনন্ত ৭টি করে অ্যান্টিভেনম মজুদের বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেন।
সভার দ্বিতীয় ভাগে জেলার বিগত মাসের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) কমলেশ মজুমদার জুন মাসের অপরাধচিত্র তুলে ধরে জানান, সামগ্রিক পরিস্থিতি সন্তোষজনক হলেও উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে খুনের সংখ্যা। সেই সাথে ডাকাতি, ছিনতাই ও মাদকের ঘটনাও ঊর্ধ্বমুখী। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো—কিশোর গ্যাং, মাদক কারবারি, খুনি ও চোরাচালানিরা আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে জামিনে বের হয়ে আসছে।
আলোচনায় জানানো হয়, মাদক ও ছিনতাইবিরোধী অভিযান জোরদার করা হবে। সীমান্তে চোরাচালান ও পুশইন রোধে বিজিবি ও পুলিশের যৌথ অভিযান অব্যাহত থাকবে।
অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, কিশোর গ্যাং, মাদক ও চোরাচালান রোধে দ্রুত একটি বিশেষ 'হটলাইন' নম্বর চালু করা হবে। নাগরিকরা তাদের আশেপাশের অপরাধের তথ্য এই নম্বরে জানাতে পারবেন এবং তথ্যদাতার পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন রাখা হবে।
শহরের যানজট ও অবৈধ দখল উচ্ছেদে নিয়মিত অভিযান চালানো হবে।
সভায় পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম বলেন, আগামী ১৬ জুলাই হিন্দু ধর্মের ঐতিহ্যবাহী রথযাত্রা উৎসব ও বিশেষ দিবস উপলক্ষে যশোরকে নিরাপদ রাখতে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, "যশোরকে সুন্দর, নান্দনিক ও নিরাপদ নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে আমরা নাগরিকদের সচেতনতা ও আইন মানার মানসিকতা প্রত্যাশা করি।" পৌর পার্কের নিরাপত্তা জোরদার এবং যানজট নিরসনে পৌরসভা নিরলস কাজ করছে বলেও তিনি জানান।
উক্ত সভায় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকারের উপপরিচালক (ডিডিএলজি) ও পৌর প্রশাসক সৈয়দ রফিকুল হাসান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সুজন সরকার, জেলা পরিষদের প্রশাসক দেলোয়ার হোসেন খোকন, যশোর চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি মিজানুর রহমান খান এবং আনসার ভিডিপির ঊর্ধ্বতন কমান্ডার মাজহারুল ইসলাম ভূঁইয়াসহ জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সকল সদস্যবৃন্দ।