প্রিন্ট এর তারিখঃ শুক্রবার ১৯ জুন ২০২৬, ৫ আষাঢ় ১৪৩৩


জাতীয়

টাঙ্গাইলের কৃতি সন্তান. বাংলা সাহিত্যাঙ্গনের উজ্জ্বল নক্ষত্র, একুশে পদকপ্রাপ্ত সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও কবি আল মুজাহিদী আর নেই

প্রকাশিত: ২০২৬-০৬-১৯ ১৮:১৬:২৫

News Image

একুশে পদকপ্রাপ্ত বর্ষীয়ান সাহিত্যিক, সাংবাদিক, কবি ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আল মুজাহিদী

নিজস্ব প্রতিনিধি:
বাংলা সাহিত্যাঙ্গনের উজ্জ্বল নক্ষত্র, একুশে পদকপ্রাপ্ত বর্ষীয়ান সাহিত্যিক, সাংবাদিক, কবি ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আল মুজাহিদী আর নেই (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।

 

আজ শুক্রবার (১৯ জুন, ২০২৬) দুপুর ১টা ৪০ মিনিটে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর।

 

তাঁর মৃত্যুতে দেশের সাহিত্য, সাংবাদিকতা ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। টাঙ্গাইলসহ সারা দেশের সাহিত্যপ্রেমী মানুষের মাঝে শোকের আবহ বিরাজ করছে।

 

দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন
পরিবার সূত্রে জানা যায়, বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন জটিলতা, হৃদরোগ ও কিডনি সমস্যাসহ নানা শারীরিক জটিলতায় দীর্ঘদিন ধরে ভুগছিলেন আল মুজাহিদী। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালের করোনারি কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) ভর্তি করা হয়। সে সময় তাঁর কিডনি কার্যকারিতা প্রায় বন্ধ হয়ে যায় এবং একটি মাইনর হার্ট অ্যাটাকও হয়েছিল বলে পরিবার জানিয়েছিল।

 

টাঙ্গাইলের মাটি থেকে জাতীয় অঙ্গনে ১৯৪৩ সালের ১ জানুয়ারি টাঙ্গাইল জেলার নারুচি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আল মুজাহিদী। তাঁর পুরো নাম হিশাম আল মুজাহিদী। ছাত্রজীবন থেকেই সাহিত্যচর্চা ও প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি বাংলা সাহিত্যের ষাটের দশকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কবি হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন।

 

শিক্ষাজীবন শেষে তিনি সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় দেশের ঐতিহ্যবাহী সংবাদপত্র দৈনিক ইত্তেফাকের সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর সম্পাদনায় সাহিত্যপাতা হয়ে উঠেছিল নবীন ও প্রবীণ লেখকদের অন্যতম আশ্রয়স্থল।

 

মুক্তিযোদ্ধা ও বহুমাত্রিক সাহিত্যস্রষ্টা
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন আল মুজাহিদী। কবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, সমালোচনা, অনুবাদ ও শিশুসাহিত্য—বাংলা সাহিত্যের প্রায় সব শাখাতেই ছিল তাঁর বিচরণ।

 

তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে হেমলকের পেয়ালা, ধ্রুপদ ও টেরাকোটা, যুদ্ধ নাস্তি, প্রাচ্য পৃথিবী, পৃথিবীর ধুলো, সৌর জোনাকি, ভিতা নুওভা, সন্ধ্যার বৃষ্টি, আলবাট্রাস এবং কাঁদো হিরোশিমা কাঁদো নাগাসাকি। এছাড়া উপন্যাস, ছোটগল্প ও শিশুসাহিত্যে তাঁর অসামান্য অবদান রয়েছে।

 

একুশে পদকসহ অসংখ্য সম্মাননা
সাহিত্য ও সাংবাদিকতায় অনন্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি একুশে পদকসহ দেশ-বিদেশের বহু সম্মাননা ও পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে জীবনানন্দ দাশ একাডেমি পুরস্কার, কবি জসীমউদ্দীন একাডেমি পুরস্কার, মাইকেল মধুসূদন একাডেমি পুরস্কার, জয়বাংলা সাহিত্য পুরস্কার এবং আরও বহু সম্মাননা।

 

শোকের ছায়া সাহিত্যাঙ্গনে
আল মুজাহিদীর মৃত্যুতে সাহিত্যিক, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতারা গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তাঁরা বলেছেন, তাঁর মৃত্যুতে বাংলা সাহিত্য ও সাংবাদিকতা এক অভিভাবকসুলভ ব্যক্তিত্বকে হারালো। তাঁর সৃষ্টিকর্ম আগামী প্রজন্মের জন্য প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

 

অপূরণীয় শূন্যতা
টাঙ্গাইলের গর্ব, বাংলা সাহিত্যের এক নিবেদিত প্রাণ সাধক এবং সাংবাদিকতার এক উজ্জ্বল নাম আল মুজাহিদীর প্রস্থান দেশের সাহিত্য-সংস্কৃতি অঙ্গনে এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি করলো। তাঁর অসংখ্য সাহিত্যকর্ম, চিন্তা ও আদর্শ বেঁচে থাকবে পাঠকের হৃদয়ে এবং বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে।

 

বাংলা সাহিত্য হারালো এক মহীরুহকে, টাঙ্গাইল হারালো তার এক কৃতী সন্তানকে।