প্রিন্ট এর তারিখঃ বুধবার ০৩ জুন ২০২৬, ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩


রাজনীতি

ভারত খুনি রাষ্ট্র, বিএসএফ খুনি বাহিনী’: সীমান্তে পুশইনের প্রতিবাদে: নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী

প্রকাশিত: ২০২৬-০৬-০৩ ২৩:৫১:৪৫

News Image

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী

উবাঈদুল হুসাইন আল্ সামি, যশোর প্রতিনিধি:
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের ‘পুশইন’ চেষ্টার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। একই সঙ্গে সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিকদের লাগাতার হত্যার ঘটনায় ভারতকে আন্তর্জাতিক আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর দাবি জানান তিনি। বুধবার দুপুরে যশোরের বেনাপোলের উত্তেজনাপূর্ণ সাদিপুর ও রঘুনাথপুর সীমান্ত এলাকা পরিদর্শন শেষে তিনি এসব কথা বলেন।

 

নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, “ভারত খুনি রাষ্ট্র ও বিএসএফ খুনি বাহিনী। তাদের বিচার হতে হবে।” তিনি অভিযোগ করেন, বছরের পর বছর ধরে সীমান্তে নিরীহ বাংলাদেশিদের গুলি করে হত্যা করা হচ্ছে। কোনো সভ্য দেশ এভাবে বিচারবহির্ভূত হত্যা মেনে নিতে পারে না। সীমান্ত হত্যার প্রতিটি ঘটনার জন্য ভারতকে আন্তর্জাতিক আদালতে জবাবদিহি করতে বাধ্য করার জন্য তিনি বর্তমান সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। 

 

বুধবার দুপুরে এনসিপি নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে সাদিপুর ও রঘুনাথপুর সীমান্তে যান। তার আগমনের খবরে স্থানীয় শত শত সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে জড়ো হন। এ সময় পুরো এলাকা স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে। উপস্থিত জনতা ‘এ দিল্লি না ঢাকা? ঢাকা, ঢাকা’, ‘সীমান্ত হত্যা রুখে দিন, চলবে না চলবে না’ স্লোগান দিতে থাকে।  

 

পরিদর্শনকালে তিনি সীমান্তের শূন্যরেখার কাছাকাছি গিয়ে বিএসএফের ‘পুশইন’ চেষ্টার স্থানগুলো ঘুরে দেখেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের দুর্ভোগের কথা শোনেন।   

 

সীমান্ত এলাকার মানুষের জীবনযাত্রা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। তিনি বলেন, “সীমান্ত এলাকার সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্ট দেখার কেউ নেই। এখানে পর্যাপ্ত হাসপাতাল নেই, ভালো স্কুল নেই, কর্মসংস্থানের কোনো ব্যবস্থা নেই। জীবিকার তাগিদে সীমান্তবাসী কোনো চোরাচালানে জড়ায় না।”  

 

তিনি পাল্টা অভিযোগ করে বলেন, “বরং ভারতীয় চোরাকারবারিরাই এসব অপকর্ম করে এবং পরে বাংলাদেশের নিরীহ মানুষের ওপর দোষ চাপায়। এরপর বিএসএফ তাদের গুলি করে মারে। এটা পরিকল্পিত হত্যা।”  

 

সীমান্ত সুরক্ষায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বিজিবিকে আরও আধুনিক ও শক্তিশালী করার দাবি জানান এনসিপির এই নেতা। তিনি বলেন, “বিজিবির পেছনে দেশের ১৮ কোটি মানুষের সমর্থন রয়েছে। তাদের মনোবল চাঙা রাখতে হবে। বিজিবির হাতে খেলনা পিস্তল দিয়ে সীমান্ত রক্ষা করা যাবে না।”  

 

বিজিবির সক্ষমতা বাড়াতে তিনি কয়েকটি সুপারিশ তুলে ধরেন। তার মতে, সীমান্তরক্ষীদের আধুনিক ভারী অস্ত্র, নাইট ভিশন সরঞ্জাম, ড্রোন ও দ্রুতগামী পেট্রোলিং কার সরবরাহ করতে হবে। একই সঙ্গে বিজিবি সদস্যদের সুযোগ-সুবিধা ও বেতন কাঠামো বাড়ানোর দাবি জানান তিনি। “যারা জীবন বাজি রেখে সীমান্ত পাহারা দেয়, তাদের পরিবার যেন আর্থিক নিরাপত্তাহীনতায় না ভোগে, সেটা নিশ্চিত করতে হবে”, বলেন নাসীরুদ্দীন।    

 

বিগত সময়ে সীমান্ত হত্যা নিয়ে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। তিনি বলেন, “কোনো বাংলাদেশি নাগরিক যদি অপরাধ করেও থাকে, তাকে বিচার ছাড়া সীমান্তে গুলি করে হত্যা করা সরাসরি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের লঙ্ঘন। রাষ্ট্র কারও জীবন নেওয়ার অধিকার রাখে না বিচার প্রক্রিয়া ছাড়া।”  

 

তিনি আরও বলেন, “ভারতের পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়, চোরাচালান ঠেকাতে গুলি চালানো হয়। কিন্তু নিহতদের মধ্যে কৃষক, রাখাল, এমনকি শিশুও আছে। এর কোনো জবাব ভারত দিতে পারে না।” 

 

বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে দল-মত নির্বিশেষে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক। তিনি বলেন, “৭১, ৯০ কিংবা ২৪-এর গণ-আন্দোলনের চেতনাকে ধারণ করে আমরা বলতে চাই, বাংলাদেশের এক ইঞ্চি ভূখণ্ড বা সার্বভৌমত্বের ওপর কোনো আঘাত দেশের মানুষ মেনে নেবে না। প্রয়োজনে রক্ত দিয়ে হলেও দেশের সীমান্ত রক্ষা করা হবে।”  

 

তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, সীমান্ত সমস্যাকে কেবল বিজিবি-বিএসএফের পতাকা বৈঠকের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে রাষ্ট্রীয়ভাবে কূটনৈতিক চাপ তৈরি করতে হবে। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক ফোরামে বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরতে হবে।  

 

উল্লেখ্য, গত রোববার ৩১ মে দিনগত রাত থেকে বেনাপোলের বিপরীতে ভারতের হরিদাসপুর সীমান্ত এলাকায় শতাধিক নারী-পুরুষ-শিশুকে জড়ো করে বিএসএফ। পরে তাদের সাদীপুর সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়। বিজিবির কঠোর অবস্থানের কারণে বিএসএফের সে চেষ্টা ব্যর্থ হয়। টানা তিন দিন শূন্যরেখায় অবস্থান করার পর সর্বশেষ মঙ্গলবার রাতে বিএসএফ জড়ো করা লোকজনকে সেখান থেকে ফিরিয়ে নেয়।  

 

এ ঘটনার পর থেকে বেনাপোলসহ আশপাশের সীমান্তে বিজিবির টহল ও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে মাইকিং করে স্থানীয়দের সতর্ক করা হচ্ছে, যাতে কেউ দালালের মাধ্যমে অবৈধভাবে সীমান্ত পার না হয়।  

 

সাদিপুর গ্রামের বাসিন্দা আবদুর রহিম বলেন, “আমরা খুব আতঙ্কে থাকি। রাতে ঘুমাতে পারি না। ছেলেমেয়েদের স্কুলে পাঠাতেও ভয় লাগে। বিএসএফ যখন তখন ধরে নিয়ে যায়, মারে।”  

 

আরেক বাসিন্দা ফাতেমা বেগম জানান, “আমার স্বামী গরু আনতে গিয়ে বিএসএফের গুলিতে মারা গেছে তিন বছর আগে। আজও বিচার পাইনি। নেতারা আসলে একটু সাহস পাই।”  

 

সীমান্ত পরিদর্শন শেষে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী সাংবাদিকদের বলেন, “এটা কোনো রাজনৈতিক ইস্যু নয়, এটা জাতীয় ইস্যু। দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন। আমরা চাই সরকার দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে এসে কঠোরভাবে বিষয়টি মোকাবিলা করুক।”  
পরিদর্শনকালে এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতা আরিফুল ইসলাম, কেন্দ্রীয় সদস্য খালিদ সাইফুল্লাহ জুয়েল, যশোর জেলা সমন্বয়ক সাইফুল ইসলামসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।