প্রিন্ট এর তারিখঃ শুক্রবার ২২ মে ২০২৬, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
প্রকাশিত: ২০২৬-০৫-২২ ১৬:৩৩:০৮
উবাঈদুল হুসাইন আল্ সামি, যশোর যশোর প্রতিনিধি:
ঈদুল আজহা দরজায় কড়া নাড়ছে। কোরবানির পশু কেনার পাশাপাশি চলছে দা, বঁটি, ছুরি ও চাপাতি কেনার ধুম। আর এ চাহিদা মেটাতে দিন-রাত টুংটাং শব্দে মুখর হয়ে উঠেছে যশোরের কামারপাড়াগুলো। লোহা পুড়িয়ে, পিটিয়ে ধারালো অস্ত্র তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন কারিগররা।
শহরের রেলগেট, চৌরাস্তা, চৌগাছা, শার্শা, ঝিকরগাছা ও মণিরামপুরের বিভিন্ন কামারপট্টিতে গিয়ে দেখা যায় একই চিত্র। কোরবানির আর মাত্র কয়েকদিন বাকি। তাই ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলছে কাজ। হাপরে কয়লার আগুনে লোহা লাল করে পিটিয়ে তৈরি হচ্ছে কোরবানির সরঞ্জাম। কেউ দিচ্ছেন পুরনো দা-ছুরিতে শান, কেউ আবার বানাচ্ছেন নতুন চাপাতি।

ষাটোর্ধ্ব চৌগাছা উপজেলার সলুয়া বাজারের কর্মকার বিকাশ রায় বলেন, “৩০ বছর ধরে এই কাজ করি। সারা বছর টুকটাক কাজ থাকে। কিন্তু কোরবানির এক মাস আগে থেকে চাপ বাড়ে। এখন দিনে ১৮ ঘণ্টা কাজ করি। রাতে ঘুম হয় না, তবুও ভালো লাগে। এই সময়টাতেই দুইটা টাকা বেশি রোজগার হয়।”
কামাররা জানান, লোহা, কয়লা ও শ্রমিকের মজুরি বাড়ায় এবার অস্ত্রের দাম কিছুটা বেশি। মাঝারি আকারের দা ৬০০-৮০০ টাকা, বঁটি ৫০০-৭০০ টাকা, চাপাতি ১২০০-২৫০০ টাকা এবং ছুরি ২০০-৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পুরনো দা-ছুরিতে শান দিতে নেওয়া হচ্ছে ৫০-১৫০ টাকা।
একই এলাকার ক্রেতা রইচ উদ্দিন রনি বলেন, “প্রতিবছর কোরবানির আগে ছুরি-চাপাতি শান দিয়ে নিই। এবার একটা নতুন চাপাতিও কিনলাম ১৮০০ টাকা দিয়ে। দাম একটু বেশি, কিন্তু ভালো জিনিস নিতে হবে। কোরবানি তো আর প্রতিদিন হয় না।”
এবার বাজারে চায়না ছুরি ও স্টিলের চাপাতির চাহিদা বেশি। তবে দেশীয় কামারের তৈরি লোহার অস্ত্রের কদরও কমেনি। অনেকেই বিশ্বাস করেন, কামারের হাতে পেটানো লোহার ধার বেশি দিন থাকে।
শার্শার ডিহি ইউনিয়নের লক্ষণপুর বাজারের কামার নিতাই কর্মকার বলেন, “এখন মানুষ ডিজাইন করা, হালকা ওজনের ছুরি-চাপাতি চায়। হাতলে কাঠের বদলে প্লাস্টিক বা স্টিলের ব্যবহার বাড়ছে। আমরা ক্রেতার চাহিদা মতো বানিয়ে দিচ্ছি। কেউ কেউ গরু জবাইয়ের জন্য স্পেশাল ছুরি অর্ডার দেয়, যার ফলা ১২-১৪ ইঞ্চি লম্বা হয়।”
পুরনো কারিগররা বলছেন, নতুন প্রজন্ম এ পেশায় আসতে চায় না। কষ্ট বেশি, আয় কম। বিকাশ রায়ের ছেলে অনিক রায় বলেন, “বাবার সাথে কাজ শিখেছি, কিন্তু আমি গ্যারেজে কাজ করি। সারা বছর বসে থাকতে হয়। শুধু কোরবানির সময় কাজ করে সংসার চলে না।”
তবে কিছু তরুণ ব্যতিক্রম। যশোর চৌগাছা উপজেলা পলুয়া গ্রামের কলেজ পড়ুয়া রাকিব হোসেন বলেন, “ইউটিউবে দেখে শিখেছি। ঈদের আগে বাবার সাথে দোকানে বসি। দিনে ২-৩ হাজার টাকা আয় হয়। পড়াশোনার খরচ উঠে যায়।”
প্রতি বছর কোরবানির সময় ধারালো অস্ত্র বিক্রিতে প্রশাসনের নজরদারি থাকে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাজিবুল ইসলাম বলেন, “অপ্রাপ্তবয়স্কদের কাছে ছুরি-চাপাতি বিক্রি নিষিদ্ধ। আমরা কামারপট্টিগুলোতে মনিটরিং করছি। কেউ যেন অস্ত্রের অপব্যবহার না করে, সেদিকে খেয়াল রাখা হচ্ছে।”
ঈদের আগের দুইদিন কামারদের ব্যস্ততা আরও বাড়ে। অনেকে শেষ মুহূর্তে ছুরি-চাপাতি কিনতে বা শান দিতে আসেন। রাত ১২টা-১টা পর্যন্ত দোকান খোলা থাকে।
ঝিকরগাছা উপজেলার কামার নেতা প্রশান্ত কর্মকার বলেন, “এই এক মাসের আয় দিয়ে আমাদের বছরের অর্ধেক সংসার চলে। তাই যত কষ্টই হোক, কাজ করে যাই। ক্রেতারা খুশি হয়ে দু’টা টাকা বেশি দিলে আমাদের পরিশ্রম সার্থক হয়।”
টুংটাং শব্দ, আগুনের ফুলকি আর হাতুড়ির ঘা—সব মিলিয়ে কোরবানির আগের এই সময়টাতে কামারবাড়ি হয়ে ওঠে উৎসবের আরেক কেন্দ্র। ধর্মীয় বিধান পালনের অন্যতম অনুষঙ্গ এই দা-ছুরি। আর তা নির্মাণ করে কারিগররা কোরবানির পুণ্যের ভাগীদার হচ্ছেন বলেই মনে করেন অনেকে। ঈদের চাঁদ ওঠার আগ পর্যন্ত চলবে এই কর্মযজ্ঞ।