প্রিন্ট এর তারিখঃ বুধবার ১৩ মে ২০২৬, ৩০ বৈশাখ ১৪৩৩
প্রকাশিত: ২০২৬-০৫-১২ ২৩:২২:১৪
উবাঈদুল হুসাইন আল্ সামি, যশোর প্রতিনিধি:
টান দিলে হাতের সাথে উঠে আসছে কার্পেটিং। পাওয়ার টিলার ব্রেক কষলে টায়ারের ঘষায় কার্পেটিং আলগা হয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে পাথরের খোয়া। এমনকি স্যান্ডেলের সামান্য ঘর্ষণেও টিকছে না রাস্তাটির কম পুরুত্বের ‘বিটুমিনের বন্ড’। নির্মাণ শেষের মাত্র তিনদিনের মাথায় পিচ-খোয়া উঠে বেরিয়ে পড়তে শুরু করেছে রাস্তার তলদেশ। এমন দৃশ্য যশোরের অন্যতম বৃহৎ বিল এড়োলের কয়েক হাজার বিঘা জমি থেকে ফসল বহনে ব্যবহৃত রাস্তাটির। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) একটি প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় কোটি টাকা ব্যয়ে রাস্তাটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে।
যশোর সদর উপজেলা প্রকৌশল দপ্তর সূত্র জানায়, ‘জে.আর.আর.আই.ডি.পি’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় রাস্তাটি নির্মাণ হয়েছে। ৪ কোটি ১০ লাখ ২৬ হাজার টাকার প্যাকেজের আওতায় রাস্তাটি নির্মাণ হয়েছে। কিন্তু সূত্র নিশ্চিত করতে পারেনি ১০৫০ মিটারের এই রাস্তা নির্মাণে ঠিক কত টাকা ব্যয় হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স সরদার ইন্টারন্যাশনাল সূত্র জানিয়েছে নির্মাণ ব্যয় ৯০ লাখ টাকা।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, রাতের আধারে তড়িঘড়ি করে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করে নির্মাণকাজ চালিয়েছেন ঠিকাদার। এরকম অনিয়ম দুর্নীতি দেখে বাধা দেওয়ার চেষ্টাও করেছেন। কিন্তু তাদের কোনো কথা শোনেননি ও বাধা মানেননি। ক্ষোভের সুরে কৃষকেরা বলেছেন, একেবারে মানহীন পিচ বা বিটুমিন ব্যবহার করায় টিকছে না নির্মাণকাজ। বেশুমার অনিয়ম-দুর্নীতি চালানো হয়েছে। তবে, এই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারসহ উপজেলা প্রকৌশলী। তাদের ভাষ্য, নির্মাণকাজ এখনো শেষ হয়নি, চলমান রয়েছে। ‘সিলকোট’ করে দিলে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।কৃষকেরা বলছেন, রাস্তাটি দিয়ে বিলের কয়েক হাজার বিঘা জমিতে উৎপাদিত ধান, পাট ও সবজিসহ অন্যান্য ফসল বহন করে নিয়ে যাওয়া হয়। আগে মাটির রাস্তা থাকাকালে বর্ষা মৌসুমে যানবাহনে ফসল বহন করা কষ্টসাধ্য ছিল। মাটির রাস্তায় যানবাহনের চাকা আটকে যেত। এবার বর্ষা মৌসুমের আগে দুর্ভোগের সেই রাস্তায় পিচের কার্পেটিং হলেও মানহীন কাজের কারণে সুফল আসছে না। কৃষকদের অভিযোগ, নিম্নমানের কাজের কারণে নির্মাণের তিনদিনের মাথায় নষ্ট হতে শুরু করে রাস্তাটি। বর্ষা মৌসুম আসার আগেই পিচ উঠে আগের কাদামাটির রাস্তায় পরিণত হবে এটি।
এড়োল বিলে জমি আছে এমন একজন কৃষক ঝাউদিয়া গ্রামের আমিনুল ইসলাম বলেন, দুদিন না যেতেই পিচ উঠে যাচ্ছে। কার্পেটিং খুবই কম পুরু। হাঁটাচলার সময় স্যান্ডেলের ঘষায় রাস্তার দুইপাশ থেকে পিচ-খোয়া উঠে যাচ্ছে। ফলে এই কাজের সুফল মিলবে না। এরচেয়ে আগের মাটির রাস্তা ভালো বরং ভালো ছিল। বর্ষার আগে এই রাস্তা আবারো আগের মতো কাদামাটির হয়ে যাবে। তিনি জানান, বিলের বিপুল পরিমাণ জমিতে উৎপাদিত ফসল এই রাস্তা দিয়ে বহন করা হয়। সরকার কৃষকের সুবিধার দিক বিবেচনায় এই রাস্তাটির নির্মাণ কাজে বরাদ্দ দিলো; আর ঠিকাদার সেই অর্থের সর্বনাশ করলো।মোহাম্মদ আরিফ নামে আরেক কৃষক ক্ষোভের সুরে বলেন, কার্পেটিং করার আগে রাস্তার উপরিভাগ পরিস্কার করতে হয়। কিন্তু সেটি না করে তড়িঘড়ি করে কাজ শেষ করা হয়েছে। অন্তত পাঁচদিন লাগার কথা নির্মাণ কাজ শেষ হতে। কিন্তু মাত্র একদিনে তা সম্পন্ন করা হয়। তিনি দাবি করেন, এই রাস্তা কার্পেটিংয়ে বিটুমিনের বদলে পোড়া মবিল ব্যবহার করা হয়েছে। তাই যদি না করা হবে তাহলে- পা দিয়ে ঘসা দিলে কার্পেটিং থেকে পাথর উঠে যাচ্ছে কেন- উলটো প্রশ্ন রাখেন তিনি। এই কৃষক আরও বলেন, ঝাউদিয়া ও চান্দুটিয়া ছাড়াও আরও কয়েক গ্রামের মানুষ এই রাস্তা দিয়ে ফসল বাড়ি নিয়ে যান। আগের মাটির রাস্তা এরচেয়ে ভাল ছিল। কয়েকদিনের মধ্যে এই রাস্তা নষ্ট হয়ে গিয়ে আগের মাটির রাস্তার চেয়ে খারাপ দশা হবে।
ঝাউদিয়া গ্রামের কৃষক সোহেল রানা বলেন, নির্মাণকাজে অনিয়ম দেখে বাধা দিয়েছিলাম। কিন্তু সেটি শোনেননি ঠিকাদারের লোকজন। তিনি বলেন, মানহীনভাবে নির্মাণকাজ হওয়ায় দুদিন না যেতেই রাস্তাটি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এতে এড়োল বিলে যাদের জমি আছে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ফসল বহনে অসুবিধা হবে। আর তাই নির্মাণকাজে অনিয়ম-দুর্নীতির তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাগ্রহণ ও রাস্তার কাজ টেকসইভাবে সম্পন্নের দাবি জানাই। ঝাউদিয়া গ্রামের কৃষক সবুজ হোসেন বলেন, এড়োল বিলের প্রায় চার হাজার একর জমির ফসল এই রাস্তা দিয়ে বাড়িতে নেওয়া হয়। তাই রাস্তার কাজে অনিয়ম দেখে বাধা দিই এবং কাজ বন্ধ রাখার অনুরোধ করি। কিন্তু ঠিকাদার হারুন অর রশিদ রাতের আঁধারে নিজের মতো করে কাজ শেষ করে চলে যান। তদারকির অভাবে নিম্নমানের উপকরণ দিয়ে রাস্তার কাজ সম্পন্ন করতে পেরেছেন ঠিকাদার। রাস্তাটি চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ছে। তবে, এসব অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করে ঠিকাদার হারুন অর রশিদ বলেছেন, একটি স্বার্থান্বেষী মহল আমার বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লেগেছে। একটি রাস্তার কার্পেটিং শেষে জমাট বাঁধতে কমপক্ষে ৭২ ঘণ্টা সময় প্রয়োজন। এখনও কাজ চলমান। তিনি দাবি করেন, নিয়ম মেনেই কাজ করা হচ্ছে এবং কোনো অনিয়ম হয়নি। ‘সিলকোটে’র কাজ শেষ হলে রাস্তাটি কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা। তখন সব ভুল বোঝাবুঝির অবসান হবে। নির্মাণকাজে অনিয়মের ব্যাপারে উপজেলা প্রকৌশলী চৌধুরী মোহাম্মদ আছিফ রেজা বলেন, রাস্তার কাজ মাত্র দুইদিন আগে শেষ হয়েছে। কাজ এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। রাস্তটিতে এখন ‘সিলকোট’ করা হবে। এটি শেষ করতে এক সপ্তাহ সময় লাগবে। ‘সিলকোট’ সম্পন্ন হলে যেসব সমস্যা হচ্ছে সেটির সমাধান হয়ে যাবে।
এলজিইডির জেলা কার্যালয়ের সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী আসিফ ইকবাল রাজিব বলেন, বিষয় টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।