জলবায়ু পরিবর্তন: সংকটের মুখোমুখি পৃথিবী

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী

আমরা ২০১৯ সাল শেষ করে ২০২০ সালে উপস্থিত হয়েছি। সাল গণনায় এই নামটা খুবই সুন্দর—টোয়েন্টি টোয়েন্টি। কিন্তু এই সুন্দরের মাঝে বিরাট এক বিষণ্নতাও মানব সভ্যতাকে ঘিরে ফেলেছে। এই পৃথিবী আর ক’বছর বাসযোগ্য থাকে এই ভাবনায় পেয়েছে ধরিত্রীর মানুষদের।

পত্রিকায় দেখলাম পৃথিবীর অদূরেই ‘বাসযোগ্য’ একটি গ্রহ পাওয়া গিয়েছে। এখন পর্যন্ত পৃথিবীই মানুষের বাসযোগ্য একমাত্র গ্রহ। এই কারণে বিকল্প বাসযোগ্য গ্রহ খুঁজে পেতে বিজ্ঞানীদের চেষ্টার অন্ত নেই। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা (নাসা) গত ৫ জানুয়ারি বলেছে, নতুন ওই গ্রহ পৃথিবী থেকে ‘মাত্র’ ১০০ আলোকবর্ষ দূরে। পৃথিবীর আকৃতির ওই গ্রহের নাম দেওয়া হয়েছে ‘টিওআই৭০০ডি’। এটি ‘টিওআই৭০’ নামের একটি নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করছে। টিওআই৭০০ডি ওই নক্ষত্রটিকে এমন দূরত্ব থেকে প্রদক্ষিণ করছে, যা ওই সৌরমণ্ডলের বাসযোগ্য অঞ্চল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। সূর্যের সঙ্গে পৃথিবীর দূরত্বের বিবেচনায় এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন বিজ্ঞানীরা। এই দূরত্বে তরল পানির অস্তিত্ব থাকা সম্ভব বলে দাবি করেছে নাসা।

নাসা জানায়, টিওআই৭০০ সূর্যের চেয়ে আকারে ৪০ শতাংশ ছোট। এর উত্তাপও সূর্যের তুলনায় অর্ধেক। টিওআই৭০০ডি গ্রহটি পৃথিবীর চেয়ে ২০ শতাংশ বড় এবং ৩৭ দিনে টিওআই৭০০ নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করে। এছাড়া পৃথিবী সূর্য থেকে যে শক্তি পায়, তার ৮৬ শতাংশ শক্তি ওই গ্রহ তার নক্ষত্র থেকে পায়।

টিওআই৭০০ডি কত বিলিয়ন, ট্রিলিয়ন বছর পর মানুষের বাসযোগ্য হবে কে জানে! আদৌ কী হবে? বিজ্ঞানীরা হয়তো এর মধ্যে আরও গ্রহ খুঁজে পাবেন। হয়তো মঙ্গলেও একদিন মানুষ বাস করবে। যেটি আবিষ্কৃত হয়নি তাকে নিয়ে আমাদের ভাবনা যেমন আছে তেমনি এই পৃথিবীকে আগামী মানুষদের জন্য বাসযোগ্য করে রেখে যাওয়াও আমাদের দয়িত্বের মধ্যে পড়ে। কিন্তু আমরা কি তা করছি?

ক্রিস্টোফার বেলির একটি বই আছে ‘দ্য বার্থ অব দ্য মডার্ন ওয়ার্ল্ড’ নামে। তাতে ১৭৮০ থেকে ১৯১৪ সময়কালকে তিনি মডার্ন কাল বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু বিজ্ঞানের বইগুলো কী বলে? ৩৭৫ বিলিয়ন বছর ধরে মডার্ন এটমস্ফিয়ার ক্রমে ক্রমে একটু একটু করে বর্তমান পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। এই সুদীর্ঘ কাল পরিক্রমার পর যে দৃশ্য আজকের অবয়বে উপস্থিত হয়েছে তা তো আবার ক্ষয়ের মুখে পড়েছে। তাতে তো বিশ্ব তার অর্জিত সবকিছু হারাবে। অর্জনে ৩৭৫ বিলিয়ন বছর লেগেছে, কিন্তু হারাতে ৩৭৫ বছর লাগবে না।

সংকট বহুমুখী। জাতিবিদ্বেষ, ধনবৈষম্য, পরিবেশ ও জলবায়ু সংকট—সবই একত্রে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। এসব সংকট থেকে ধরণীকে উদ্ধার করতে না পারলে মানবজাতি যাবে কোথায়? টিকে থাকবে কীভাবে?

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার বিখ্যাত হিবার্ট বক্তৃতায় বলেছিলেন, মানুষ জীবজগতে অনন্য সাধারণ কারণ সে মুক্তির সন্ধানে নিজেকে সৃষ্টির কেন্দ্রে খুঁজে পায়। সে-ই একমাত্র জীব যে তার চারপাশের নানা জিনিসের একটা ঐক্যের সূত্র খুঁজে পায়। রবীন্দ্রনাথ মানবজাতিকেই তার সংকটে তার ত্রাণকর্তা ভেবেছেন। কিন্তু বর্তমান বিশ্বের অনেক সঙ্কটে মানবজাতি নিজেকে অসহায় মনে করছে। বিশেষ করে জলবায়ু সংকটে। জাতিবিদ্বেষ এবং ধনবৈষম্যও সংকট। তবে তার অস্তিত্ব বিপন্ন করে ফেলার মতো সংকট নয়।

বনের অনলে রাষ্ট্র যায় জ্বলিয়া। গত এক বছরব্যাপী দাবানল বিশ্বকে পেয়ে বসেছে। অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য নিউ সাউথ ওয়েলস দাবানলের কারণে মহাদুর্যোগে পড়েছে। হাজার হাজার মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ে পালাতে বাধ্য হচ্ছে। বহু ঘরবাড়ি পুড়ে মানুষ আশ্রয়হীন হয়েছে। মারা পড়ছে লাখ লাখ প্রাণী। ইন্দোনেশিয়ান দাবদাহ থেমেছে আবার ব্রাজিলের বন পুড়ে ছারখার হয়ে গেছে—এসব এই জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে। শিল্প উন্নত বিশ্বের কারণে জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে।

গত ২ ডিসেম্বর ২০১৯ স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদে জলবায়ু সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও এই সম্মেলনে যোগদান করেছিলেন। সম্মেলন শেষ হয়েছে ১৫ ডিসেম্বর। প্রধানমন্ত্রীর সম্মিলিতভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি মোকাবিলা করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। বিষয়টি জরুরি এ বিষয়ে কারও দ্বিমত না থাকার পরও দরিদ্র দেশগুলোকে সাহায্যের বিষয়ে সহায়তা করার ব্যাপারে ধনী দেশগুলো কৃপণতা করছে। অথচ বিষয়টা এমন যে সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের মোড় ঘোরানো যাবে না।

বাংলাদেশ সমুদ্র উপকূলবর্তী দেশ। এ কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের যেসব দেশ সর্বাগ্রে ক্ষতিগ্রস্ত হবে তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বাংলাদেশে আগামী দুই দশকের মধ্যে উপকূলবর্তী এলাকায় ব্যাপক লোক বাস্তুচ্যুত হবে। এর মধ্যেই বাস্তুত্যাগী হয়ে শহরে বস্তিবাসী হচ্ছে। সাগরের পানির উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় তারা গৃহহীন হয়েছে।

কক্সবাজার থেকে খুলনা পর্যন্ত উপকূলবর্তী বৃহৎ জেলা চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, বরিশাল, খুলনার উপকূলবর্তী এলাকা ডুবে যাবে। কয়েক কোটি লোক বাস্তুত্যাগী হবে। জাতিসংঘ যে বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করেছিল সেই বিশেষজ্ঞ কমিটি স্বীকার করছে যে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সারা বিশ্বে বড় রকমের ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। ২০১৫ সালে প্যারিসের জলবায়ু সম্মেলনে একটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। জাতিসংঘের সদর দফতরে আয়োজিত এক সম্মেলনে ১৭০টি দেশ প্যারিস সম্মেলনে গৃহীত সিদ্ধান্তে স্বাক্ষর প্রদান করেছিল।

আমেরিকা ছিল অন্যতম স্বাক্ষরকারী দেশ। অথচ ওবামার পরে ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর আমেরিকা প্যারিসের সেই সিদ্ধান্ত থেকে নিজের নাম প্রত্যাহার করে নিয়েছে। আমেরিকার জলবায়ু পরিবর্তনের একজন প্রধান কন্ট্রিবিউটর। নাম প্রত্যাহারের কারণ হচ্ছে ট্রাম্প বিশ্বাস করে না যে মানুষের সৃষ্ট কোনও কারণে জলবায়ু পরিবর্তন হতে পারে। তারা বিশ্বের অন্যতম সুপার পাওয়ার। তাদের বোঝাবে কে?

অথচ সমালোচকরা বলছেন ট্রাম্প এই সিদ্ধান্ত ব্যবসায়ীদের স্বার্থেই নিয়েছেন। সুপার পাওয়ার হিসেবে আমেরিকা যদি জলবায়ু বিপর্যয় ঠেকানোর উদ্যোগে শরিক না হয় তবে সম্পূর্ণ পরিকল্পনাটাই হতাশাগ্রস্ত হবে। অথচ বিষয়টি দেখেও না দেখার ভান করার সময় উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। ট্রাম্প বলেছেন, ভূ-উষ্ণায়ন কমানোর কোনও প্রকল্পে আমেরিকা কোনও দান-খয়রাত করবে না। ২০১৫ সালের প্যারিস সম্মেলনে গরিব দেশগুলোকে সাহায্য প্রদানের জন্য ১০০ বিলিয়ন ডলারের একটা ফান্ড করার কথা ছিল অথচ ২০১৯ সালে মাদ্রিদ সম্মেলনে দেখা যাচ্ছে ধনী দেশগুলো কোনও অনুদান প্রদান না করায় ফান্ডের অবস্থার তেমন কোনও উন্নয়ন হয়নি।

শিল্প বিপ্লবের পর ১৮৫০ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত বিষাক্ত গ্যাস নির্গমন করেছে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো, রাশিয়া, জাপান, ভারত ও চীন। উন্নয়নশীল দেশগুলো তাদের উন্নয়নকে গতিশীল করার জন্য শিল্পায়নে মনোযোগী হওয়ায় শিল্পের প্রসার ঘটানোর চেষ্টা করছে। তাতে তেলের ব্যবহার উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। সুতরাং উষ্ণায়ন থেমে নেই বরং বৃদ্ধি পাচ্ছে। পৃথিবীর ৫৭ শতাংশ বিজ্ঞানী বিষয়টা নিয়ে বারবার সতর্ক করার পর কারো মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারছে না। গ্রিনল্যান্ড এবং আইসল্যান্ডের বরফ দ্রুত গলে যাচ্ছে। গ্রহের করুণ অবস্থার প্রতি কেউ যদি যত্নবান না হয় তাহলে বিশ্ব বিপন্ন হয়ে যাবে।

কোপেনহেগেন থেকে মাদ্রিদ সম্মেলন পর্যন্ত জলবায়ু নিয়ে সম্মেলন হয়েছে কিন্তু ‘অশ্ব ডিম্ব’ ছাড়া আর কিছুই হয়নি। অনুরূপ অবহেলায় তো বিশ্ব বাঁচবে না। জলবায়ুর বিষয়টা বিশ্বের সম্মিলিত প্রয়াসের ব্যাপার। সুতরাং এখন এটা নিয়ে জাতিসংঘের সোচ্চার না হলে এই গ্রহের ভবিষ্যৎ অন্ধকার।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

বাংলাদেশ জার্নাল/কেআই

© Bangladesh Journal


from BD-JOURNAL https://www.bd-journal.com/opinion/102880/জলবায়ু-পরিবর্তন-সংকটের-মুখোমুখি-পৃথিবী
Share To:

Tangail Darpan

Post A Comment: