আগে অর্থনীতি, তারপর বাকি সব

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা

আগের বছরের ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচনের পর গেলো বছর অর্থাৎ ২০১৯ সালের ৭ জানুয়ারি পরপর তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠন করে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ। নির্বাচনের আগে এবং পরে যে কথাগুলো প্রধানমন্ত্রী বারবার বলেছেন, তা হলো তিনি এমন এক বাংলাদেশ দেখতে চান, যে দেশটি অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হয়ে বিশ্বের বুকে মাথা তুলে দাঁড়াবে। এবং একথা মানতেও হবে, তার শাসনামলে বাংলাদেশ উচ্চতর প্রবৃদ্ধির স্বাদ পেয়েছে, মানুষের মাথাপিছু আয় বেড়েছে এবং বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন দেখে দেখে মানুষের মনে একটা উন্নয়ন স্পৃহা তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, প্রায় টানা এক দশক ধারাবাহিকভাবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করে আসছে বাংলাদেশ। ২০০৯ সালে ৫ শতাংশের বৃত্ত ভেঙে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের মধ্য দিয়ে নতুন এক অধ্যায় শুরু করে বাংলাদেশ। সবশেষ ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৮ দশমিক ১৫ শতাংশ অর্জিত হয়েছে। ২০২২ সালের আগেই ডাবল ডিজিট (দুই অঙ্ক) প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। একইভাবে ২০০৯ সালে মাথাপিছু আয় ছিল ৭০৯ মার্কিন ডলার। এখন সেটা ১৯০০ ডলার অতিক্রম করেছে। সে সময় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ১০ বিলিয়ন ডলার। এখন তা ৩২ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে। রফতানি ছিল ১০ বিলিয়ন ডলার। ২০১৯ সালে তা ৩০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। আগামীতে ৫০ বিলিয়ন ডলার রফতানি আয়ের স্বপ্ন দেখছে বাংলাদেশ। স্থায়ী কর্মসংস্থানে খুব একটা আশানুরূপ প্রবৃদ্ধি না হলেও অস্থায়ী কর্মসংস্থান, বিকল্প কর্মসংস্থান এবং কর্মমুখী শিক্ষার প্রসারের মাধ্যমে কর্মক্ষম মানুষ আর শ্রমশক্তিকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছে সরকার। একইভাবে প্রবাসী আয়, আমদানি, স্থানীয় বিনিয়োগ, বিশেষ করে সরকারি বিনিয়োগ, মূল্যস্ফীতির চাপ নিয়ন্ত্রণ, বাজেট বাস্তবায়ন, রাজস্ব আদায়সহ সবকটি সূচকে টানা কয়েক বছর সাফল্য দেখিয়েছে বাংলাদেশ।

কিন্তু মনে হচ্ছে দ্রুতগতিতে ছুটে চলা অর্থনীতির কোথায় যেন একটা ছন্দপতন হয়েছে। বিশেষ করে অর্থনীতির মূল যে চালিকাশক্তি ব্যক্তিখাত, সেখানে কোনও চাঞ্চল্য নেই, স্থবিরতা না হলেও একটা দম বা উদ্যমের অভাব লক্ষণীয়। চলতি বছরের শেষ দিকে এসে একমাত্র প্রবাসী আয় ছাড়া সামষ্টিক অর্থনীতির সব সূচক নিয়েই চিন্তিত সংশ্লিষ্টরা। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগে গতি না থাকায় কর্মসংস্থানের গতিতেও ভাটা পড়েছে, ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট কাটেনি, বৈদেশিক লেনদেনে ঘাটতি বজায় আছে এবং সমাজে বৈষম্য প্রকট আকার ধারণ করছে। কাগজে-কলমে দারিদ্র্যের হার কমেছে, কিন্তু সেটা উচ্চ প্রবৃদ্ধির হারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বড় প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও বেসরকারি বিনিয়োগ কেন গতি পায়নি, সেটাই হতে পারে এ বছরের বড় অর্থনৈতিক ভাবনা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স ছাড়া বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রায় সব সূচকই নিম্নমুখী হয়ে পড়েছে। বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আমদানি ও রফতানি বাণিজ্য। দীর্ঘদিন ধরে দেশে বাণিজ্য ঘাটতি থাকলেও সম্প্রতি তা আরও বেড়ে গেছে। এত দিন আমদানি বাড়ার প্রবণতা ছিল। চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসের হিসাবে দেখা গেছে, আমদানি আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৩ দশমিক ১৭ শতাংশ কমে গেছে। যা কিছু আমদানি হচ্ছে এর মধ্যে খাদ্যপণ্যই বেশি। সার্বিক আমদানির পাশাপাশি শিল্প খাতে বিকাশের প্রধান উপকরণ মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানিও অনেক কমে গেছে। রফতানি খাতেও বিরাজ করছে নেতিবাচক পরিস্থিতি।

ঠিকমতো এগোতে পারেনি সরকারের বাজেট বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াও। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্যমতে, গত জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত রাজস্ব আহরণ হয়েছে ৬৫ হাজার ৯৬ কোটি টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২০ হাজার কোটি টাকা কম। রাজস্ব খাত থেকে প্রত্যাশিত পরিমাণে আয় না হওয়ায় ব্যয়ের অর্থের সংস্থান করতে সরকারকে ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ধার করতে হচ্ছে। এর ফলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে আসছে। চলতি অর্থবছরের অর্ধেক এখনও পার হয়নি, এরই মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে পুরো বছরের জন্য সরকারের ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ছুঁই ছুঁই করছে। বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলছে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে সরকার অভ্যন্তরীণ খাত থেকে মোট ৭৭ হাজার ৩৬৩ কোটি টাকা ঋণ নেবে বলে ঠিক করে। এর মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ৪৭ হাজার ৩৬৩ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার কথা। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের পাক্ষিক প্রধান অর্থনৈতিক সূচকে বলা হয়েছে, চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে ২৮ নভেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকার ৪১ হাজার ৩৬২ কোটি টাকারও বেশি ঋণ নিয়েছে। অর্থাৎ পাঁচ মাসের মধ্যেই সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে বাজেটে টার্গেটের সিংহভাগ নিয়ে বসে আছে। দ্রুতই হয়তো পুরো বছরের ঋণের লক্ষ্যমাত্রার সম্পূর্ণ টাকাটাই নিয়ে নিতে হবে।

যে দিনগুলো আমরা কাটাচ্ছি, সেগুলো কতখানি ভালো সেটিই বড় ভাবনার বিষয়। দেশের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির মূল সূচক বেশি থাকার পরও কেন মন্দার মতো পরিস্থিতি, সেটি গুরুত্ব দিয়ে চিন্তা করা প্রয়োজন। সঞ্চয়পত্রে সুদের পতন, ব্যাংকেও সুদের হার কমে যাওয়া অতি সাধারণ মানুষের কাছে চরম দুশ্চিন্তার বিষয়। পুঁজিবাজার আজ পর্যন্ত সোজা হয়ে দাঁড়াতেই পারল না। ব্যাংকগুলোর অনাদায়ী ঋণের পরিমাণ বাড়তে বাড়তে কোথায় গিয়ে ঠেকে, সেটিও কেউ ধারণা করতে পারছে না। অর্থনীতির এই চেহারাটা কাঙ্ক্ষিত নয়।

সারা বিশ্বের অর্থনীতিতেই এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে। এর প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও পড়ছে। এ মুহূর্তে এ ধরনের চাপ সামাল দিতে নিজেদের অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়াতে হবে। সেই সঙ্গে ব্যবসা ও বিনিয়োগ বাড়ানোর কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। সরকারবিরোধীরা কতখানি ঠিক বলছেন, তা নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে। কিন্তু অর্থনীতিকে সামলে নিতে না পারলে সুশাসন প্রত্যাশা করা যাবে না। ২০২০-এর ভাবনা হোক আগে অর্থনীতি, তারপর বাকি সব।

লেখক: প্রধান সম্পাদক, জিটিভি ও সারাবাংলা

বাংলাদেশ জার্নাল/কেআই

© Bangladesh Journal


from BD-JOURNAL https://www.bd-journal.com/opinion/101632/আগে-অর্থনীতি-তারপর-বাকি-সব
Share To:

Tangail Darpan

Post A Comment: