কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার, হারাচ্ছে গ্রামীণ ঐতিহ্য

আব্দুল্লাহ আল নোমান
‘‘ফজরের নামাজ পড়ে গরু-মহিষ নিয়ে যেতাম খলায় (ধান শুকানোর স্থান)। রোদ্রের প্রখরতা বাড়ার আগে মাড়াই শেষ হতো। একইভাবে রাতের বেলায় কুপির আলোতে চলতো ধান মাড়াইয়ের কাজ। তবে এখন আর সেই দিন নেই। এখন মেশিন দিয়ে আধাঘণ্টায় ধান মাড়াই শেষ হয়ে যায়।’’- এমনটি বলছিলেন সিলেটের সীমান্তবর্তী কানাইঘাট উপজেলার কুওরঘড়ি গ্রামের কৃষক বাহার উদ্দিন।
তিনি বলেন, প্রযুক্তির কল্যাণে সবকিছু সহজ হয়ে গেছে। আগে ধান তোলার মৌসুমে গ্রামে গ্রামে উৎসব-আনন্দ হতো, তা এখন নেই। এখন ধানের আবাদ বেশি হচ্ছে ঠিকই, কম সময়ে ধান মাড়াই, শুকানোর কাজও সম্পন্ন করা যায়; কিন্তু প্রযুক্তির কারণে গ্রামের আনন্দ উচ্ছ্বাস হারিয়ে গেছে বলে মন্তব্য এ কৃষকের।
কানাইঘাট উপজেলার যে কয়জন প্রভাবশালী কৃষক রয়েছেন তাদের মধ্যে একজন বাহার উদ্দিন। তিনি ৩০০ বিঘা জমির মালিক। এ বছরও ধানের ভালো ফলন পেয়েছেন তিনি। কুওরঘড়ি গ্রামে তার বাড়ির পাশে তৈরি করেছেন ধানের খলা। মেশিনে ধান মাড়াই চলছিল তখন। এ সময় তার সঙ্গে কথা হয়।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আগে গ্রামের সব গৃহস্থরা খলা দিতেন। কিন্তু এখন পুরো গ্রাম ঘুরেও খলার দেখা পাবেন না। কারণ মেশিনে বাড়ির ছোট আঙিনায় ধান মাড়াই ও শুকানোর কাজ হয়ে যায়। এ জন্য খুব কম কৃষক বাহিরে জমিতে খলা প্রস্তুত করেন। ফলন বাড়লেও অনেক গৃহস্থের জমি আবাদের বাইরে থাকে। একই সঙ্গে গরু পালনও কমে গেছে বলে জানান তিনি।


উপজেলার হারাতৈলের রাঙারাই গ্রামের কৃষক খলিলুর রহমান। তার বয়স নব্বইয়ের কোটায়। তিনি বললেন, অগ্রহায়ণ মাস এলেই উৎসব শুরু হতো। গ্রামের সকলে ধানের খলা প্রস্তুত করতেন। খলায় ধানের আঁটি এনে স্তূপ করে রাখা হতো। পরে গরু দিয়ে ধান মাড়াই চলতো। আর গ্রামের ছোট বয়সীরা দলবেঁধে খলায় রাত কাটাতো। লুকোচুরি গোল্লাছুট খেলতো। গ্রামের মা-চাচিরাও রাতে পিঠা-পুলির আয়োজন করতেন সেখানে। পিঠা-পুলির মৌ মৌ গন্ধে পুরো গ্রাম ছড়িয়ে পড়তো। এখন পিঠা তৈরি হয়, তবে আগের মতো উৎসব হয় না। যার যার ঘরেই পিঠা তৈরি করা হয়।
তার কথার সঙ্গে সায় দিয়ে একই গ্রামের সত্তরোর্ধ্ব মজিদ মিয়া বললেন, আগের দিনে অগ্রহায়ণ মাস এলেই তারা ধানের খলায় রাত কাটাতেন। যাদের গরুর সংখ্যা কম তারা পাশের কারও কাছ থেকে গরু নিয়ে এসে ধান মাড়াই করতেন। এখন সেই দিন নেই। গরু দিয়ে মাড়াই করার কথা শুনলে নাতি-নাতনিরা হাসে। কারণ তারা এসব দেখেনি। এখন মেশিনেই মাড়াই হয়, তারা তাই দেখছে।
প্রবীণ আছিয়া বেগম বললেন, আগে নতুন ধান উঠার পর তারা ঢেঁকি দিয়ে চাল বের করতেন। এজন্য বাড়ির নারীরা ব্যস্ত সময় পার করতো। নতুন চাল দিয়ে নানান পদের পিঠা-পায়েস তৈরি হতো। এ সময় নতুন জামাইদের দাওয়াত করা হতো। এখন এভাবে উৎসব হয় না বলেও জানান তিনি।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, সিলেট জেলায় এই মৌসুমে ১ লাখ ৪০ হাজার ১৮৫ হেক্টর জমিতে রোপা আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ ছিল। এরমধ্যে ৯২ হাজার ৪৪১ হেক্টর জমিতে উফশী এবং ৪৭ হাজার ৭৪৪ হেক্টর জমিতে স্থানীয় জাতের ধান রোপণের জন্য নির্ধারণ করা হয়। তবে, আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১ হাজার ১৭৫ হেক্টর বেশি জমিতে ধানের আবাদ হয়েছে।


জমিতে ধান পেকে গেছে। মাঠজুড়ে সোনালী ধানের ছড়াছড়ি। ভোরের শিশির সোনালী ধানের শীষে মুক্তদানার মতো ঝিলিক ছড়ায়। নভেম্বরের মাঝামাঝি সময় থেকে কৃষকরাও আগাম জাতের ধান কাটা শুরু করেছেন। এ পর্যন্ত প্রায় ৫০ ভাগ জমির ধান কাটাও শেষ হয়েছে। ধান কেটে নিয়ে কেউ কেউ জমা করছেন খলায়। এ জন্য খলাভর্তি ধানের স্তূপ দেখা গেছে। সেখানে মেশিনে ধান মাড়াইয়ের পর শুকানো আর ঝাড়াইয়ের কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষাণীরা।
ধানের বাম্পার ফলন হলেও মাড়াই নিয়ে চিন্তায় পড়তে হচ্ছে না কৃষকদের। এখন কম সময়ে মেশিনে মাড়াই শেষ হচ্ছে। একইভাবে ধান কাটতে অনেক স্থানে রিপার যন্ত্রের ব্যবহার হচ্ছে। প্রযুক্তির ব্যবহারে কৃষিকাজ সহজ হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে সহজতর হলেও হারিয়ে যাচ্ছে বাঙালির প্রাচীন ঐতিহ্য আর সংস্কৃতি। গ্রামের কৃষকরা বলছেন, যত দিন যাচ্ছে ততই সহজতর হচ্ছে কৃষি ব্যবস্থা। আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহারের কারণে এখন সনাতন পদ্ধতির চাষাবাদ প্রায় ভুলতে বসেছেন তারা। একইভাবে কৃষির সঙ্গে সম্পৃক্ত নবান্নসহ নানা গ্রামীণ উৎসবও হারিয়ে যাচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সিলেটের আঞ্চলিক উপ-পরিচালক মজুমদার মো. ইলিয়াস বলছেন, এবার প্রত্যাশার চেয়েও বেশি আমনের আবাদ হয়েছে। কৃষকরা ধান ঘরে তুলতে শুরু করেছেন। কৃষকরা উন্নত জাতের ধান রোপণ করায় ধানের বাম্পার ফলন পেয়েছেন বলে জানান তিনি।



সিলেট/আব্দুল্লাহ আল নোমান/বকুল


from Risingbd Bangla News https://ift.tt/381WyNq
Share To:

Tangail Darpan

Post A Comment: