২০১৯: বছরজুড়ে আলোচনায় জাতীয় পার্টি

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

প্রয়াত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের হাতে গড়া জাতীয় পার্টির জন্য বিদায়ী বছর ছিল আলোচিত। বছরের শুরুতেই অসুস্থ অবস্থায় এরশাদ একাদশ সংসদে রংপুর-৩ আসনের সাংসদ হিসেবে শপথ নেন। রওশন এরশাদের পরিবর্তে এরশাদের বিরোধীদলের নেতা নির্বাচিত হওয়া, ছোট ভাইকে বিরোধীদলীয় উপনেতা নির্বাচিত করা, জিএম কাদেরকে হটিয়ে স্ত্রী রওশনকে সংসদ উপনেতা করা, দল থেকে ছেটে ফেলে আবারো দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও অবর্তমানে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেয়া, এরশাদের অফিস থেকে ৪৩ লাখ টাকা চুরির ঘটনায় ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়।

বছরের মাঝামাঝিতে দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যু, মৃত্যুর পর দলের নেতৃত্ব নিয়ে রওশন এরশাদের সঙ্গে জিএম কাদেরের দ্বন্দ্ব, বিরোধীদলীয় নেতা হওয়ার লড়াই, দলের শীর্ষ নেতাদের বিরোধিতার মুখেও এরশাদের আসনে ছেলে রাহগির আল মাহে সাদ এরশাদের সাংসদ নির্বাচিত হওয়া, জিএম কাদেরের বিরুদ্ধে ভাতিজা এরিক এরশাদের জিডি, এরিক ইস্যুতে এরশাদের ফ্ল্যাটে বিদিশার অবস্থান ও সংবাদ সম্মেলন, বিদিশার বিরুদ্ধে জিএম কাদেরের পক্ষে পাল্টা জিডি, জাতির জনক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও শহীদ নূর হোসেনকে নিয়ে দলের মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গার বেফাঁস মন্তব্য এবং নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা, রওশনকে ছাড়াই ২৮ ডিসেম্বর জাপার কাউন্সিলে জিএম কাদেরের চেয়ারম্যান হওয়া, রওশনকে দলের প্রধান পৃষ্ঠপোষক করা, দলের বিবাদমান জ‌্যেষ্ঠ নেতাদের কো-চেয়ারম্যান করে ভাবীর কাছ থেকে ভাগিয়ে নেয়াসহ আলোচিত ঘটনায় বছরটিতে ঘুরেফিরে আলোচনায় ছিল জাতীয় পার্টি।

প্রথম বিরোধীদলীয় নেতা এরশাদ

দীর্ঘদিন দেশের সেনাপ্রধান ছিলেন, ছিলেন ৯ বছর দেশের ক্ষমতাধর রাষ্ট্রপতি। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত কখনো তিনি বিরোধী দলের নেতা হতে পারেননি। অথচ দশম সংসদে তার দল বিরোধীদলের আসনে বসে। তারপরও তিনি বিরোধী নেতা হতে পারেননি। স্ত্রী রওশন এরশাদই হন বিরোধী নেতা। দলের চেয়ারম্যান হিসেবে সন্তুষ্ট থাকতে হয় এরশাদকে। বরং তার স্বপ্ন ছিল মৃত্যুর আগে আরেকবার জাতীয় পার্টিকে ক্ষমতা নিয়ে যাওয়া। কিন্তু দলটির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সেই স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি।

২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাসে অসুস্থ হয়ে পড়েন এইচ এম এরশাদ। এ অবস্থায় ৩০ ডিসেম্বর তার নেতৃত্বে একাদশ নির্বাচনে অংশ নেয় জাতীয় পার্টি। কোন প্রকার প্রচারে অংশ নেয়া ছাড়াই এরশাদ রংপুর-৩ আসন থেকে সাংসদ নির্বাচিত হন। তার দল জাতীয় পার্টি আবারো সংসদের বিরোধীদল হয়। স্ত্রী রওশনের পরিবর্তে এই প্রথম সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা হওয়ার ভাগ্য জুটে সাবেক রাষ্ট্রপতির। ১০ জানুয়ারি একাদশ জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ এবং বিরোধীদলীয় উপনেতা হিসেবে জি এম কাদেরকে স্বীকৃতি দেন স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী।

এরশাদের অফিস ‘৪৩ লাখ টাকা’ চুরি

বিরোধীদলীয় নেতা ও জাপা চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদের অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে দুর্বৃত্তরা ২৯ এপ্রিল দিবাগত রাতে তার বনানী অফিস থেকে ৪৩ লাখ টাকা চুরি করে নিয়ে যায়। কার্যালয়ের নিচতলায় চেয়ারম্যানের কক্ষের লকার ভেঙে টাকা নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় গুলশান থানায় মামলা হলেও এখনো এর রহস্য উন্মোচন করতে পারেনি পুলিশ। ঘটনার সঙ্গে জড়িত সুনির্দিষ্ট কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। উদ্ধার করা যায়নি ৪৩ লাখ টাকাও।

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যু

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুর ঘটনা বিদায়ী বছরের সবচেয়ে  আলোচিত খবর। তার মৃত্যুর খবর দেশ-বিদেশের গণমাধ্যমও বেশ গুরুত্বের সঙ্গে প্রচার করে।

দীর্ঘদিন সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের লাইফ সাপোর্টে থাকাবস্থায় ২০১৯ এর ৪ জুলাই শেষ নিঃশাস ত্যাগ করেন এরশাদ।

রওশন বিরোধীদলীয় নেতা ও কাদের চেয়ারম্যান

অসুস্থ অবস্থায় হঠাৎ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এক সাংগঠনিক আদেশে জিএম কাদেরকে সরিয়ে বিরোধীদলীয় উপনেতা হিসেবে রওশন এরশাদকে মনোনীত করেন। ছোট ভাইকে ব্যর্থতার দায়ে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান থেকেও সরিয়ে দেন তিনি। স্পিকারকে চিঠি দিয়ে রওশনকে উপনেতা নির্বাচিত করেন সাবেক এ রাষ্ট্রপতি। কিন্তু কিছুদিন না যেতেই এরশাদ আবারো তার ছোটভাই জিএম কাদেরকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নিয়োগ দেন। একদিন পরে তাকে তার অবর্তমানে জাপার চেয়ারম্যান নিয়োগ দেন এরশাদ। অসুস্থ এরশাদের এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে সারা দেশে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। যদিও এ সময় জিএম কাদেরের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠে, অসুস্থ এরশাদকে জিম্মি করে চেয়ারম্যানকে দিয়ে এ ধরনের সাংগঠনিক আদেশ করানো হয়েছে। জিএম কাদেরকে অবৈধ চেয়ারম্যান দাবি করে বছর শেষে রিটও হয়েছে উচ্চ আদালতে।

জাপা চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদের মৃত্যুর পরদিন তড়িঘড়ি করে দলের মহাসচিব জিএম কাদেরকে দলের চেয়ারম্যান ঘোষণা দেন। এতে বিদ্রোহ করেন দলের একটি অংশ। যারা বিরোধীনেতা বেগম রওশনপন্থী হিসেবে পরিচিত। তারা জিএম কাদেরের বিরুদ্ধে বিবৃতিও দেন। এমন সময়ে শুরু হয় বিরোধী নেতার পদ দখল নিয়ে বেগম রওশন ও জিএম কাদেরের দ্বন্দ্ব। কাদেরের পক্ষে দলের একটি অংশ স্পিকারকে চিঠি দিলে হঠাৎ করে রওশন এরশাদকে চেয়ারম্যান ঘোষণা করে বিবৃতি দেয়া হয়। তারপর দফায় দফায় উভয়গ্রুপের নেতাদের বৈঠকের পর অবশেষে রওশনকে বিরোধীনেতা হিসেবে মানতে বাধ্য হন জিএম কাদের।  শেষ পর্যন্ত বেগম রওশন এরশাদই বিরোধী নেতা হন। রওশন এরশাদ বিরোধী নেতা হলে জিএম কাদের চেয়ারম্যান হবেন এমন সমঝোতার কথাও প্রচার করা হয় জাতীয় পার্টিতে।

রাঙ্গার বেফাঁস মন্তব্য

১০ নভেম্বর শহীদ নূর হোসেন দিবসের দিন দলীয় এক অনুষ্ঠানে জাতীয় পার্টির মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও শহীদ নূর হোসেনকে নিয়ে বেফাঁস মন্তব্য করেন। এতে রাঙ্গার বিরুদ্ধে সারা দেশে প্রতিবাদের ঝড় উঠে। দলের একটি অংশও তার বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ হয়। রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তার বিরুদ্ধে সরকারি দলের নেতাকর্মীরা ঝাড়ু মিছিল করে তার বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ করে। সংসদে তাকে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে বলা হয়। দলের জ্যেষ্ঠনেতা কাজী ফিরোজ রশীদ ও মুজিবুল হক চুন্নু তার বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে সংসদে বক্তব্য রাখেন। এমনি অবস্থায় রাঙ্গা তার বক্তব্যের জন্য ক্ষমা চেয়ে বক্তব্য প্রত্যাহার করে নেন। সংসদে দাঁড়িয়েও তিনি জাতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন।

কাদেরের বিরুদ্ধে এরিকের জিডি ও বিদিশার অভিযোগ

এইচ এম এরশাদের মৃত্যুর পর লালন পালনে অবহেলা, খেতে না দেয়া, পিতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিতকরাসহ চাচা জিএম কাদেরের বিরুদ্ধে ভাতিজা এরিক এরশাদের অভিযোগ বছর শেষে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়।

এমন অভিযোগের খবরে দীর্ঘদিন পরে এরশাদের ফ্ল্যাটে ছেলে এরিকের পাশে এসে দাঁড়ান বিদিশিা এরশাদ। সেই থেকে এখনো এরিককে নিয়ে আছেন সেখানে। জিএম কাদের তার লোকজন দিয়ে বিদিশাকে বের করে দিতে চাইলে এরিক মায়ের সঙ্গে এরশাদের ফ্ল্যাটেই থাকবেন মর্মে জানিয়ে জিএম কাদেরের বিরুদ্ধে গুলশান থানায় জিডি করে। এতে জিএম কাদেরের বিরুদ্ধে মানসিক অত্যাচারের অভিযোগও করে এরিক। তারপর বিদিশা এরশাদ এরিকের বর্তমান অবস্থা জানিয়ে জিএম কাদেরের বিরুদ্ধে গণমাধ্যমে বিভিন্ন অভিযোগ করেন। বিদিশার বিরুদ্ধেও পাল্টা জিডি করেন জিএম কাদেরের অনুসারীরা। এখনো বিষয়টি সুরাহা হয়নি। এরিক তার মায়ের সঙ্গে বাবার ফ্ল্যাটেই আছে।

রওশনকে ছাড়াই কাউন্সিল 

রওশন এরশাদকে দলের প্রধান পৃষ্ঠপোষক করা হলেও এ পদে রাজি হননি তিনি। তাই তার অনুপস্থিতিতে ২৮ ডিসেম্বর জাতীয় পার্টির কাউন্সিল হয়েছে। এতে মৌখিক ভোটে রওশনকে প্রধান পৃষ্ঠপোষক, জিএম কাদেরকে চেয়ারম্যান, মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা নির্বাচিত হন।

 

ঢাকা/নঈমুদ্দীন/সাইফ



from Risingbd Bangla News https://ift.tt/2SHmQiS
Share To:

Tangail Darpan

Post A Comment: