মান্না দে’র কফি হাউজে

মিলটন আহমেদ

‘কফি হাউজের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই, কোথায় হারিয়ে গেল সোনালি বিকেলগুলো সেই...।’- আহা! সেই সোনালি বিকেল হয়তো এখন আর নেই। কিন্তু কফি হাউজের সেই আড্ডার রেশ আজও আছে। যে কফি হাউজকে ঘিরে কিংবদন্তি শিল্পী মান্না দে’র সাড়া-জাগানো সেই গান; সেই হাউজে বসে নিচ্ছিলাম কফির স্বাদ। চোখ ভরে দেখলাম স্বপ্নের কফি হাউজ।

২০১৪ সালে প্রথমবার গিয়েছিলাম কফি হাউজে। তখন ছিলাম তিনজন। এবার একা। একাকীত্ব বোধ তার সবটুকু চেষ্টা দিয়ে মন খারাপ করিয়ে দিতে চাইলেও উপলব্ধির জন্য একা সর্বত্তোম সংখ্যা। একাকীত্বে আনন্দ আছে। সেই আনন্দে বুঁদ হয়ে ছিলাম এবার!

মধ্য কলকাতার যে হোটেলে উঠেছি, সেখান থেকে মাত্র কুড়ি মিনিটের দূরত্বে কালের সাক্ষী কফি হাউজ। যুগে যুগে যা ইতিহাস সৃষ্টি করে চলেছে। কলকাতা এসেছি চারদিন হয়ে গেছে। সেদিন ছিল পঞ্চম দিনের সকাল। আসার পর থেকে কফি হাউজে ঢুঁ মারার সুযোগ খুঁজছিলাম। কিন্তু সময় বের করা হয়ে উঠছিল না। একটু বলে রাখি, আমি এখানে এসেছি বাংলাদেশ বনাম ভারতের মধ্যকার ক্রিকেট সিরিজের অংশ হিসেবে।  প্রথম দিবা-রাত্রির টেস্ট ম্যাচ ঘিরে কলকাতায় দারুণ উন্মাদনা তৈরি করেছেন বিসিসিআই-এর নতুন প্রেসিডেন্ট সৌরভ গাঙ্গুলি। অসাধারণ আয়োজন ইডেন গার্ডেন স্টেডিয়ামসহ কলকাতা শহরে। সেই আয়োজন দেখার লোভ তো ছিলোই! রীতিমতো ইতিহাসের জন্ম হতে যাচ্ছে এই গোলাপি বলের টেস্ট ম্যাচ ঘিরে। তারই অংশ হবো- অন্যরকম অনুভূতি মনের মধ্যে কাজ করছিল। আর তাই ক্রীড়া সাংবাদিক ভাই বন্ধুদের সঙ্গে ইডেনেই সময় কাটিয়েছি ক’দিন। সে কারণে কফি হাউজে যাওয়ার সুযোগ করে উঠতে পারিনি। সেই সুযোগ অবশেষে পেয়ে গেলাম তেইশ নভেম্বর, শনিবার। গোলাপি টেস্টের দ্বিতীয় দিন।

 

ইন্ডিয়ান কফি হাউজের প্রবেশদ্বার

 

যাই হোক, কফি হাউজে যাওয়ার আরও একটি বিশেষ কারণ ছিল। তা হলো- কিছু বই কেনা। না, কফি হাউজে বই পাওয়া যাওয়ার কথা নয়। আসলে কফি হাউজের অবস্থান যে এলাকায়, সেই জায়গার নাম কলেজ স্ট্রীট। এশিয়ার বড় বইয়ের বাজার এটি। অন্তত বই, বইয়ের দোকান আর বইপ্রেমীর ভিড় দেখে কথাটি মানতেই হবে। এই বাজারের মাঝামাঝি কফি হাউজের অবস্থান। বইপ্রেমী মানুষ এখানে আসেন বেশি। তারা কেউ শিক্ষার্থী, কেউ শিক্ষক, কেউ সাহিত্যিক। তাদের কারণেই কফি হাউজে প্রতিদিনই একই দৃশ্য, একই হুল্লোড়। সবাই একবার ঢুঁ মেরে যান এই হাউজে।

রাইজিংবিডি ডটকম অনলাইন নিউজ পোর্টালের সাহিত্য সম্পাদক তাপস রায়। প্রায়ই তার সঙ্গে আমার বই নিয়ে, ভালো লেখা নিয়ে টুকটাক আলোচনা হয়। একদিন তিনি আমাকে বেশ কয়েকটি বইয়ের নাম দিয়েছিলেন। সম্ভব হলে সময় করে যেন পড়ি। এটাও বলেছিলেন, বইগুলির সবক’টি বাংলাদেশে না-ও পেতে পারি। আমি প্রায়ই কলকাতা যাই তিনি জানেন। তাই পরামর্শ দিয়েছিলেন ওখান থেকে কেনার।

ট্যাক্সি থামলো ইন্ডিয়ান কফি হাউজের সামনে। প্রথম কেউ এখানে এলে ধন্দে পড়ে যান। সাইনবোর্ডে ‘ইন্ডিয়ান কফি হাউজ’ লেখা দেখে ভুল জায়গায় এসেছেন ভেবে নেন। আশেপাশের লোকজনের কাছে জিজ্ঞাসা করার পর ভুল ভাঙ্গে তাদের! ইন্ডিয়ান কফি হাউজই আসলে মান্না দে’র কফি হাউজ।

শুরুতেই বলেছি, আমি একা। গন্তব্য কফি হাউজ। কফি হাউজ নিয়ে সাড়া-জাগানো সেই গানটি মনের মধ্যে বারবার অনুরণন তুলছে। গলার মধ্যে এসে আটকে যাচ্ছে। অনেকক্ষণ যাবত। গাইতেও পারছি না। আমার গানের গলা মোটেও শ্রুতিমধুর নয়। আবার গলার ভেতর থেকে সরাতেও পারছি না। মনে হচ্ছিল কণ্ঠ নালির মধ্যে দলা পাকিয়ে আছে গানটি। হৃদয়ে ঢেউও খেলে যাচ্ছিল। কফি হাউজের গেইট দিয়ে ঢুকতে ঢুকতে মনে হচ্ছিল যেন ইতিহাস ছুঁতে চলেছি। আমি তখন অন্য অনভূতিতে মগ্ন। এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ!

 

কফি হাউজের ভেতরে লেখকের ছবি

 

১৫ বঙ্কিম চ্যাটার্জি স্ট্রীটের ইন্ডিয়ান কফি হাউজে যখন ঢুকলাম, তখন দুপুর বারোটা পেরিয়ে গেছে। এই সময় কলেজ স্ট্রীট এলাকাটায় ভিড় বাড়তে থাকে। একটি বড় ভবনের দ্বিতীয় আর তৃতীয় তলা ঘিরে কফি হাউজ। অনেক বড় জায়গাজুড়ে এর অবস্থান। আমি নিচতলায় উঁকি দিলাম। কোথাও কোনো টেবিল ফাঁকা নেই। বাইরে থেকেই গমগম শব্দে মুখরিত ভাব টের পাচ্ছিলাম। ঝকঝকে তকতকে সবকিছু। এই সময় ভিড় কিছুটা বেশি থাকে। আমি সিঁড়ি মাড়িয়ে দোতলায় উঠে গেলাম। বেশি সময় অপেক্ষা করতে হলো না। ফ্লোরে মাঝারি আকারের সব টেবিল। টেবিল ঘিরে চারটি বসার চেয়ার। বেশিরভাগ টেবিলেই দু’জন বসে আছেন। তাও আবার প্রেমিক-প্রেমিকা টাইপের। তাই ওদের মাঝখানে গিয়ে বসার সাহস আমার হলো না। অগত্যা দাঁড়িয়ে থেকে সুযোগ খুঁজছিলাম কখন কোন জুটির আসর ভাঙ্গে! দূরে দেখলাম দু’জন একটি টেবিল ছেড়ে উঠছে। অমনি দ্রুততার সাথে গিয়ে বসে পড়লাম একটি চেয়ারে। কিন্তু অস্বস্তি ভেতরে। এই টেবিলে আমি একা! ওয়েটারকে খুঁজলাম। একা দেখে খুব একটা পাত্তা দিল না। নাকি আমার আগের অর্ডারগুলো নিয়ে ব্যস্ত- ঠিক বুঝলাম না। এখানে শুধু কফিই নয়, নানা রকমের ফাস্টফুড মেলে।  আমি শুধু কফি দিতে বললাম। তারপর অপেক্ষার পালা।  কফি হাউজে কফি পান করতে পারার সুযোগ পেয়ে আমি তখন রোমাঞ্চিত!

কফি হাউজ সব সময় সরগরম থাকে আগতদের ভিড়ে। কোথাও পা ফেলার জায়গা নেই! কেউ কফি পান করছেন, সঙ্গে সিগারেট। কেউ বা শুধুই কফি। ফাস্টফুডও খাচ্ছেন অনেকেই। আমি কফির উষ্ণতার সাথে ছিলাম ৩০ মিনিটের মতো। পুরোটা সময় দেখলাম- গরম কফির উষ্ণ হাওয়ায় যেন পূর্ণ কফি হাউজ!

খাবারের মেন্যু লিস্টে স্পষ্ট করে লেখা আছে, ১৯৫৫ সালে কফি হাউজ চালু হয়। হিসাব করলে বয়স দাঁড়ায় ৬৪ বছর। সময়টা দীর্ঘ। বয়স বাড়লেও এর ব্যস্ততা যেন একটুও কমেনি। জৌলুস কমেনি একটুও। মনে হলো বাঙালির শহর কলকাতার বয়সের সঙ্গে কফি হাউজেরও বেড়ে ওঠার অনেক মিল। কফির চাহিদা যেন বিন্দুমাত্র কমেনি। মানুষ ছুটে আসে এখানে শুধুই কি এক পেয়ালা  গরম কফি পানের আশায়? নাকি কফি হাউজে আসার পেছনে রয়েছে ভিন্ন কোনো অনুভূতি? উত্তরটা তারাই ভালো বলতে পারবেন যারা এখানে আসেন।

মান্না দে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন ২০১৩ সালের ২৪ অক্টোবর। হার্ট এটাকে। কিন্তু কফি হাউজকে ঘিরে বহমান বাঙালির আবেগে কি কখনো ভাটা পড়বে- এই প্রশ্ন ঘুরেফিরে আমাদের নাড়া দেয়। একটি বিষয় না বললেই নয়। যে গানটি নিয়ে বাঙালির এতো আবেগ, আমরা অনেকেই জানি না গানটির রচয়িতার নাম। জানি না কম্পোজার কে ছিলেন। বেশিরভাগ শ্রোতা শুধু জেনে এসেছি গানটি গেয়েছেন কিংবদন্তী শিল্পী মান্না দে। গানটির রচয়িতা গৌরিপ্রসন্ন মজুমদার। আর এই গানের যিনি মিউজিকের কাজ করেছেন তার নাম সুপর্ণকান্তি ঘোষ। মান্না দে-কে কতটা ভালোবাসে কলকাতার মানুষ, সহজেই টের পাওয়া যায়। প্রতিবছর মান্না দে’র জন্মদিনে কলকাতার কলেজ স্ট্রীটে তাঁর স্মরণে পালিত হয় রক্তদান কর্মসূচি। বড় বড় ব্যানার, ফেস্টুনে ছেয়ে যায় কফি হাউজের আশেপাশে পুরো এলাকা। সেগুলো জানান দেয় বাঙালির হৃদয়ে মান্না দে’র জায়গাটা অন্য কেউ দখল করতে পারেনি এখনো। শ্রেণিবিচারে সব মানুষের আবেগের জায়গাটা এখনো মান্না দে-কে ঘিরে, এখনো কফি হাউজকে ঘিরেই বয়ে যাচ্ছে। 

 

সুজাতার পেইন্টিং

 

যে টেবিলে আমি বসেছিলাম, কিছুক্ষণ পর সেখানে আরও দু’জন এসে বসলেন। একজন রাজেশ, অন্যজন নন্দন। ওরা স্ন্যাক্স-এর অর্ডার দিলেন। আমার কফি প্রায় শেষ। আমার পরিচয় দিয়ে বললাম কলকাতায় বাংলাদেশ আর ভারতের মধ্যকার টেস্ট ম্যাচের জন্য এসেছি। পরে একটি ছবি তুলে দিতে অনুরোধ করলাম। ওদের কাছ থেকেই  জানতে পারলাম, প্রতিদিন কফি হাউজে আসেন সাংবাদিক-সাহিত্যিক-কবি-প্রাবন্ধিক-লেখকসহ সব শ্রেণীর বিখ্যাত লোকজন। ওরা দু’জন কলকাতায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। প্রায়ই আসেন কফি খেতে খেতে আড্ডা দিতে। 

কফি হাউজের দেয়ালের বিভিন্ন স্থানে কয়েকটি বড় বড় ছবি। চেনার চেষ্টা করলাম। চিনতে পারিনি। ছবিগুলির মধ্যে একটিমাত্র মেয়ের ছবি। অনুমান করলাম, হয়তো ইনিই মান্না দে’র গানের সেই সুজাতা। গানের বাকি চরিত্রগুলোর ছবিও আছে দেয়ালে। এখনো যেন অমলিন সবকিছু। প্রথমবার যখন আমি কফি হাউজে গিয়েছিলাম তখন নোবেলজয়ী বাঙালি অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন সেখানে গিয়েছিলেন। তাঁকে ঘিরেই ছিল অন্যদের আগ্রহের জটলা। কয়েকজন পুলিশ তাঁর নিরাপত্তায় নিয়োজিত ছিল। সবার সঙ্গে কথা বলছিলেন হাসিমুখে। একটি টেলিভিশন চ্যানেলের রিপোর্টারকে দেখেছিলাম সাক্ষাৎকার নিচ্ছিলেন। জেনেছিলাম, অমর্ত্য সেন কলকাতায় এলে কফি হাউজে একবার আসেন। শুধুই কি কফি পান করতে আসেন, নাকি কফি হাউজ ঘিরে বহমান বাঙালির আবেগ তাকেও এখানে টেনে আনে?

কলকাতার কফি হাউজ আর ঢাকায় আমাদের মধুর ক্যান্টিনের মধ্যে যেন কোথায় একটু মিল আছে। মধুর ক্যান্টিনের স্মৃতি আমাদের অনেক গাঢ়। আর কফি হাউজের স্মৃতিও জমা হলো মানসপটে। কফি হাউজ আমাকেও আবেগতাড়িত করেছে। মান্না দে’র গানের সেই কফি হাউজ। মান্না দে এখন নেই। কিন্তু তাঁর প্রতি, তাঁর গানের প্রতি ভক্তকুলের অগাধ ভালোবাসা দেখে আমি অভিভূত। কফি হাউজ যতদিন থাকবে, মান্না দে’র প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ততদিন থাকবে।



ঢাকা/তারা



from Risingbd Bangla News https://ift.tt/2ONicOb
Share To:

Tangail Darpan

Post A Comment: