নদী নাকি ভাগাড়!

আগে অনায়াসে নদীর পানি খাওয়া যেত। এখন খাওয়া তো দূরের কথা, পানিতে হাত লাগলেই চুলকানি হয়

বাংলাদেশ

রূপগঞ্জ প্রতিনিধি

বালু নদীর পাড় ধরে হাঁটছিলেন জায়েদ হোসেন খন্দকার। উদ্দেশ্য, এর প্রকৃত অবস্থা দেখা। এমন সময় উৎকট গন্ধ এসে লাগল নাকে। গন্ধ কীসের জানতে চাইলে স্থানীয় আলামিন বলেন, এটা নদীর পচা পানির গন্ধ। মানুষ আর শিল্প-কারখানার বর্জ্য মিশে নদীর পানি পচে গেছে।

তিনি জানান, প্রায় দেড় যুগ ধরে নদীর পানির এ অবস্থা। দিন দিন অবস্থা আরও খারাপের পথে। আগে অনায়াসে নদীর পানি খাওয়া যেত। এখন খাওয়া তো দূরের কথা, পানিতে হাত লাগলেই চুলকানি হয়। 

রূপগঞ্জের কোল ঘেঁষে প্রবহমান এক সময়ের খরস্রোতা বালু নদ এখন দূষণ-দখলে মৃতপ্রায়। নয়ন জুড়ানো রূপ তার ক্ষয়ে যেতে শুরু করেছিল দুই যুগ আগে। নদে এখন মাছ নেই। বেড়েছে মশার উপদ্রব। কমে গেছে ফসলের উৎপাদন। বেড়েছে রোগবালাই। দূষিত পানির দুর্গন্ধে তীরবর্তী এলাকার মানুষের দুর্ভোগও বেড়েছে পাল্লা দিয়ে। বিপন্ন হয়ে যাচ্ছে প্রাণ-পরিবেশ। বিপর্যস্ত মানুষের জীবন। রাজধানী ঢাকার পয়োবর্জ্য ও শিল্প কারখানার বর্জ্য পড়ে এ নদের পানি এখন আলকাতরার মতো কালো হয়ে গেছে। তাই স্থানীয়রা একে ‘পচা’ পানি বলে। রাজধানী ঢাকার খিঁলগাও, ডেমরা, বেড়াইদ, গুলশান ও রূপগঞ্জের ৫০ গ্রামের লাখো মানুষের কাছে বালু নদের পচা পানি এখন অভিশাপ।

গাজীপুর, ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ এলাকায় বালু নদীর অবস্থান। এটি বেলাই বিল ও ঢাকার উত্তর-পূর্ব বিস্তীর্ণ জলাভূমির ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ডেমরার কাছে শীতলক্ষ্যা নদীতে পড়েছে। আঁকাবাঁকা নদীটির দৈর্ঘ্য ৪৪ কিলোমিটার, গড় প্রস্থ ৭৯ মিটার। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাব, নদী খনন প্রকল্প বাস্তবায়ন না হওয়া, রাজধানী ঢাকার অপরিশোধিত পয়ঃবর্জ্য ফেলাসহ নানা কারণে বালু নদীটি মৃতপ্রায়। 

বর্তমানে বালু নদীর পানি কুচকুচে কালো হয়ে গেছে। দখল-দূষণের কারণে নদীটির কোনো কোনো জায়গা এতটাই সংকুচিত হয়ে গেছে যে, দেখলে ডোবা মনে হয়। ঢাকা শহরের ওয়াসার ময়লা পানি, অবৈধ দখল, শিল্প-কারখানার বর্জ্য নদীটির দুরবস্থার জন্য দায়ী। 

বালু নদী থেকে দুটি ছোট নদী নরাই আর দেবধোলাই প্রবেশ করেছে ঢাকায়। ছোট নদী দুটি দিয়ে ঢাকার বিভিন্ন এলাকার শিল্প-কারখানার বর্জ্য গিয়ে পড়ছে বালু নদীতে। বছরের পর বছর আবর্জনা মিশে নদীর পানি নষ্ট হয়ে গেছে। 

ঢাকা ওয়াসার একটি সূত্র জানায়, ঢাকা থেকে দৈনিক প্রায় ৩০ লাখ ঘনমিটার পয়ঃবর্জ্য, বিভিন্ন শিল্প-কারখানার সাড়ে ৫ হাজার ঘনফুট দূষিত বর্জ্য নদীতে পড়ছে। এছাড়া বালু, নরাই ও দেবধোলাই নদীর ওপরে আছে সহস্রাধিক ঝুলন্ত পায়খানা। এসব থেকে আরও প্রায় এক হাজার ঘনফুট পয়ঃবর্জ্য নদীতে মিশছে। 

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা) ২০১৩ সালের জুন থেকে নিয়মিতভাবে বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, বালু ও তুরাগ নদের পানির পিএইচের পরিমাণ পরীক্ষা করে আসছে। সংস্থাটির মতে, বালু নদীতে বিভিন্ন সময় পিএইচের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ৮ থেকে ২০ গুণ বেড়ে যায়। 

ওয়াসা সূত্রে জানা গেছে, পচা পানি রোধে বালু, নড়াই ও দেবধোলাই নদের দুই তীরের গ্রামগুলোকে বাঁচাতে ৮০০ কোটি টাকা ব্যয়ে বিশাল শোধনাগার নির্মাণ করার কথা রয়েছে। কিন্তু অদৃশ্য শক্তির আঙ্গলির ইশারায় এ প্রকল্পও লাল ফিতায় বন্দী রয়েছে। 

বালু-শীতলক্ষ্যা বাঁচাও আন্দোলনের নেতা, কলামিস্ট ও গবেষক লায়ন মীর আব্দুল আলীম বলেন, ঢাকাকে যেমন বাঁচানো জরুরি, ঠিক তেমনি বালু নদী সংলগ্ন ৫০ গ্রামের লাখো মানুষকে বাঁচানোটা জরুরি। পচা পানির কারণে শুধু মানুষই নয়, পরিবেশ, কৃষি এমনকি জীববৈচিত্র্যের বিপর্যয় ঘটছে। জরুরি ভিত্তিতে পচা পানি রোধ করা প্রয়োজন। নয়তো আন্দোলন চলবে।

রূপগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, বালু নদীতে এখন মাছ নেই। মাছ না থাকায় নদীর পাড়ের খিলগাঁওয়ের দাসেরকান্দি গৌঢ়নগরের জেলেপাড়ার অধিকাংশ জেলে চলে গেছেন অন্য পেশায়। 

পরিবেশবিদ ও পানি বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত বলেন, দীর্ঘদিন ধরে আমাদের অপরিকল্পিত কর্মকাণ্ডে এ অবস্থা তৈরি করেছে। সম্প্রতি হাইকোর্টের দেওয়া নির্দেশনা বালু নদীসহ দেশের নদীগুলোকে বাঁচাতে মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে। হাইকোর্টের নির্দেশনা পুরোপুরি বাস্তবায়ন হলে নদীগুলোর অবস্থার উন্নতি হবে। 

রূপগঞ্জের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মমতাজ বেগম বলেন, ঢাকার পয়ঃবর্জ্য ও শিল্প-কারখানা নদীটির দূষণের জন্য দায়ী। শিগগিরই দায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হবে।

বাংলাদেশ জার্নাল/এসবি

© Bangladesh Journal


from BD-JOURNAL https://www.bd-journal.com/bangladesh/97420/নদী-নাকি-ভাগাড়
Share To:

Tangail Darpan

Post A Comment: